চন্দনগরের ছেলেটা আজ বিশ্বজয়ী।

পাড়ায় আবির খেলায় মাতল পোড়েল পরিবার। গোটা চন্দননগর যেন ঈশানের এই কৃতিত্বকে কুর্নিশ জানাতে তার বাড়ির সামনে উপস্থিত। সংবাদমাধ্যমের হুড়োহুড়ি। এটাইতো স্বাভাবিক। ২০০৩ সালে বিশ্বকাপ ক্রিকেট ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার কাছে সৌরভবাহিনীর পরাজয়ের যন্ত্রণা থেকে আজও বাঙালি ক্রিকেটপ্রেমীরা বেরোতে পারেনি। সেই কাটা ঘায়ে মলমের কাজ করল ঈশানের পারফরমেন্স (ফাইনালে অস্ট্রেলিয়াকেই পরাজিত করেছে পৃথ্বী সাউ, ঈশান পোড়েলরা)। হোক না জুনিয়র বিশ্বকাপ। যেকোনও বিশ্বকাপের লড়াই-ই গুরুত্বপূর্ণ, কঠিন।

2018 U-19 Cricket World Cup Champion Team

আজ ঈশানকে নিয়ে আমরা বাঙালিরা মাতামাতি করছি, গোটা দেশ তাকে নিয়ে আলোচনা করছে, কিন্তু আমরা কজন খবর রাখি তার এই বিশ্বকাপ যাত্রাটা কতটা কঠিন ছিল। কতটা দুশ্চিন্তায় ছিল ঈশান এবং তার পরিবার?

বিশ্বকাপের শুরুটা মোটেও সোজা ছিল না ঈশানের জন্য। গ্রুপ লিগে ভারতের প্রথম ম্যাচেই বড় ধরনের চোট পায় ঈশান। তখন সে মাত্র ৪.১ ওভার বল করেছে।

বোলিং রান আপের ‘ফলো থ্রুয়ের’ সময় গোড়ালি মোচকে যায় ঈশানের। সে যখন চোট পেয়ে ড্রেসিং রুমের দিকে ফিরে যাচ্ছিল, তখনও বুঝতে পারেনি তার চোট কতটা গুরুতর। টিম ফিজিও জানান, এই চোট শুধু গোড়ালি মচকানোই না, ঈশানের বাঁ পায়ের টিস্যু ছিড়ে যাওয়ায় এই বিশ্বকাপে আগামী ম্যাচগুলোয় তার খেলার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। তারপর বিদর্ভের অনূর্ধ্ব ১৯ দলের আদিত্য ঠাকরেকে ঈশানের পরিবর্তে নেওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তে লাগে। ভেঙে পড়ে ঈশান। ভেঙে পড়ে তার পরিবারের সদস্যরাও। কিন্তু ‘চন্দননগর এক্সপ্রেস’ যে হার মানার ছেলে নয়। দাঁতে দাঁত চেপে মানসিক লড়াইটা চালিয়ে গিয়েছিল। মানসিক যন্ত্রনা নিয়ে সাইডলাইনে বসে তখন শিভম মাভি ও কমলেশ নাগারকোটিদের খেলা দেখছিলেন অনূর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা বোলারের তকমা পাওয়া এই বঙ্গসন্তান। রাহুল দ্রাবিড়ের নির্দেশে ঈশানকে ভারতে ফেরত পাঠানো হয়নি। তাকে নিউজিল্যান্ডে উন্নতমানের চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। খুব কঠিন ছিল সময়টা, বলেছেন ঈশান। দেখা গেল দ্রুত চোট সারিয়ে আশ্চর্যভাবে ১২ দিনের মাথায় আবার মাঠে ফিরল ঈশান। এবারের ম্যাচ বাংলাদেশের সাথে কোয়ার্টার ফাইনালে বল করলেন পাঁচ ওভার, রান দিলেন মাত্র ৮। বোঝা গেল, রাহুল দ্রাবিড়ের বিশ্বাস কেন ছিল এই বঙ্গ সন্তানের উপর। সামনে লক্ষ্য সেমিফাইনাল। বিপক্ষ চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান। জ্বলে উঠলেন ঈশান। বর্ডারের ওপার থেকে আসা বোমার জবাব কিভাবে দিতে হয় তা যেন অনেক আগেই রপ্ত করে ফেলেছিল সে! পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনের ‘টপ অর্ডার’ একাই ভাঙলেন ঈশান। চার উইকেট নিয়ে একইসঙ্গে দু’দিন আগে আইপিএলের নিলামে টিম না পা‍ওয়ার দগদগে ক্ষততেও একইসঙ্গে প্রলেপ দিলেন।

ভারতে জয়ের ব্যবধান ২০৩ রান। এ’দিকে অন্য সদস্যরাও নিজেদের ভূমিকায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হচ্ছেন।

পুরো টুর্নামেন্টই দুর্দান্ত শুবমান গিল, পৃথ্বী সাউ, অনুকূল রায়।

ফাইনালে প্রতিপক্ষ গ্রুপ লিগের সেই অস্ট্রেলিয়া। ঈশানের ক্ষতটা এখনও ভরেনি। যে টিমের বিরুদ্ধে নেমে চোট পেয়েছিলেন, সেই টিমকে হারানোর সুযোগ সামনে। আগের দুটো ম্যাচে ভাল বল করে তখন ঈশানের আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে। ‘ফলো থ্রু’-এর সময় কোমরটা ভালই জোর দিয়ে নামাচ্ছিল সে। মাভির সাথে বোলিং ওপেন করল। ঈশানের তৃতীয় ওভারের প্রথম বলেই এল প্রথম সাফল্য। তারপর আবার আরেক ওপেনারকে সরিয়ে দেন ঈশান। ভারতকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি।

ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে ভারতের নায়ক দিল্লির মনজিৎ কালরা। ট্রফি জিতল ভারত। তবে ছেলের প্রথম দুটো উইকেট যে ভারতের জয়ের ভীত গড়ে দিয়েছিল, এটা এখন বলতে ভোলেন না ঈশানের বাবা চন্দ্রনাথ পোড়েল। বিশ্বজয়ের পর রাহুল দ্রাবিড়ের হাতে বিশ্বকাপ তুলে দেন ভারতীয় অধিনায়ক পৃথ্বী সাউ। এই দৃশ্য বোধ হয় সকল ক্রিকেট প্রেমীদের স্মৃতিতে সাজানো থাকবে।

সব শেষে যেটা বলতে হয়, ঈশানদের দৌঁড় যেন এখানেই শেষ না হয়ে যায়। সিনিয়র দলে খেলা এবং নিজেকে প্রমাণ করা কিন্তু আরও কঠিন। যুব বিশ্বকাপের বহু তারকাকেই কিন্তু পরবর্তী সময় আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। আবার যুবরাজ সিং, মহম্মদ কাইফ, বিরাট কোহলি, শিখর ধাওয়ান, রোহিত শর্মারা কিন্তু সিনিয়র টিমেও সমানভাবে ঝড় তুলেছেন। রাহুল দ্রাবিড় চাইছেন তাঁর ছাত্ররাও সেরকমই নজির রাখুক। আর আমরা বাঙালিরা চাই ‘চন্দননগর এক্সপ্রেস’ আরও দ্রুত গতিতে ছুটুক এবং সৌরভ গাঙ্গুলীর অধরা স্বপ্নপূরণ করুক।

অনেক অনেক শুভেচ্ছা ঈশান।