এমন ঝিম ধরা দুপুরেই ঘুঘু ডাকে নিশ্চিন্দিপুরের ঘন সবুজ বাঁশবনে, পাশেই সরু পথ, যেপথ ধরে একটু এগোলেই অপু-দুর্গার ভিটে, মাটি, উঠোন, পেয়ারা গাছটা। লাউ শাকের লকলকে লতা বিছিয়ে উঠেছে মাচার ওপর… কুবো, ঘুঘু, কোকিল পাল্লা দিয়ে ডেকে চলে এমন গরমের দুপুরে, আর দাওয়ায় বসে ইন্দির ঠাকরুন গুনগুন করে খনখননে গলায় যপ করেন কৃষ্ণ নাম।
কলকাতায় ভিটে বলে কিছু হয় না… বসতবাড়ি, শরিকিবাড়ি-পোড়োবাড়ি, ফ্ল্যাটবাড়ি হয়। ভিটেবাড়িগুলি ওই নিশ্চিন্দিপুর, দেউলপুর, মহদিপুরেই রয়ে গেছে, ঘুঘুর ডাকের মতোই। আমার ভিটে বাড়ি বলে কিছু ছিল না। মায়ের ও বাবার ছিল… সেও প্রায় অনেকদিন আগে। কলকাতায় একটানা কোকিলের ডাক শুনে বাবা-মায়ের নিজেদের ভিটেবাড়ির কথা হয়তো মনে পড়ে যায়, আমার ফ্ল্যাট বাড়ির দুপুরগুলোয় মনে পড়ে অপু-দুর্গার কথা, নিঝুম দুপুরে বাঁশপাতার সরসর শব্দ, তেঁতুল-মাখা খাবার সময় অপুর ফিসফিস কথা শুনতে পাই মনের গভীরে… দুপুরগুলোয় শৈশব ফিরে আসে- … এই ঝিম ধরা গ্রীষ্মের দুপুরগুলো একই থেকে গেছে… কোকিলের ডাকটাও… ।
আর একদিন আনমনা দুপুরে কম্পিউটারের টেবিলের পাশের জানলা দিয়ে দেখি অনেক দূরের বিরাট বড় ঝাঁকড়া গাছটা খিলখিল করে হাসছে… কী রসিকতায় এত হাসি কে জানে! ঝাঁ ঝাঁ রোদে হালকা সবুজ কচি পাতাগুলো ঝিলমিল করছে আর এদিক ওদিক হেলেদুলে সব আলস্য ঝেড়ে খিলখিলিয়ে উঠছে। এক একজন লোক থাকে না, যারা বড় হয়, বুড়ো হয় তাও তাদের বয়স বাড়ে না, তারা বেমক্কা হেসে ওঠে, ঠা ঠা রোদে গান গায়, ‘রক্তকরবী’র বিশু পাগল আর ‘হযবরল’-এর হিজি বিজ বিজ-এর মতো; এই গাছটাও তাই। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে নেশা ধরে যায়… চোখে ঝিলমিলও লেগে যায়… কিন্তু তাও দেখি গাছটাকে এখন রোজ। এতদিন কেন দেখিনি কি জানি! হোয়াটস অ্যাপ-এর ঘাড়ে সব দায় চাপিয়ে দিয়ে না দেখা দুপুরগুলোর ক্ষতি পুষিয়ে নিতে হবে।
পূর্ব দিকের বাড়িটাতে অনেক পায়রা পোষে কেউ… ওদের ছাদের ওপরে আকাশ জুড়ে পায়রাগুলো চক্কর দেয়… একবার সকালে রোদ-ঝলমলে আকাশে আর একবার দুপুর-শেষের-বিকেলে লালচে আভা গায়ে মেখে। ঝকঝকে সাদা কিংবা পাটকেলে অথবা ধূসর ডানায় রোদের ঝিলিক ওদের উড়ানকে রাজকীয় করে তোলে, কি যে ভালো লাগে দেখতে! আর ওদের বৃত্ত ক্রমশ বড় হয়…নতুন নতুন বন্ধু হয় হয়তো ওদের! কিংবা মাসি, পিসি, পাড়াতুতো দিদি সবাইকে নিয়ে ওরা ঘুরতে বেরোয়!… স্বাধীনতা পেয়েও ওরা ছেড়ে যায় না পুরনো আশ্রয়, মানুষের বশ্যতা… ফিরে ফিরে আসে… খাঁচার বাঁধনে আর কৃতজ্ঞতায় ওরা আবদ্ধ। আমাদের মতোই।
অঙ্কন- অর্পণ সাধুখাঁ।