”এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা আগের প্রজন্মের মতো কেবল পাড়ার মোড়ে বা রকে বসে আড্ডা না দিয়ে, কিংবা সরকারি চাকরি হল না— এই ক্ষোভে নিজেদের নষ্ট না করে রুজি-রোজগারের ব্যবস্থা করে। স্থানীয় কাউন্সিলরের আশীর্বাদে ধন্য হলে তারা ছোট ছোট হকার স্টল খোলে কিংবা জ়োম্যাটো, সুইগি, ফ্লিপকার্ট, অ্যামাজ়ন-এর মতো সংস্থার হয়ে মোটরবাইক চড়ে ডেলিভারি বয়ের কাজ করে। তারা কল সেন্টার বা বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করে, আন্দোলনের চাহিদা ছাড়াই। তারা ঘাম ঝরায়, কিন্তু ১২ জুলাই কমিটির নাম শোনেনি কোনও দিন। এরা ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপ দুনিয়ায় ওতপ্রোত জড়িত, মোবাইল রিচার্জ বা ওটিপি ব্যবহারে চোস্ত, কিন্তু এরা কেউ কোনও দিন সাহিত্যপত্রিকা বা জীবনানন্দের কবিতা পড়েনি।

এরা দিনরাত্রি কাজ করে, মৃণাল সেনের ছবির সর্বহারাদের মতো মোটেই নয়। বরং এরা এখন ‘সব পেতে হবে’র দলে। বঞ্চনা এখন আউট অব ফ্যাশন, ঠিক যেমন আদর্শ আর বুদ্ধিচর্চা।”

৩০ ডিসেম্বর সকালের আনন্দবাজার পত্রিকায় সফল প্রশাসক শ্রী জহর সরকারের লেখা “নতুন বাঙালি” পড়লাম। লেখাটির শেষ লাইনে মৃণাল সেনের প্রসঙ্গ ছিল। সেইদিন সকালেই খবর এল, ৯৫ বছর বয়সী মহীরূহ, মৃণাল সেন দেহরক্ষা করেছেন।

ইদানীং ফেসবুক আর ওয়াটসঅ্যাপে খুব স্মার্ট একটি বক্তব্য বিস্তর ভাইরাল হয়েছে। শ্রী চন্দ্রিল ভট্টাচার্যের কোনও এক বিতর্ক সভায় বলা “বাঙালির সংরক্ষণ জরুরি” এই জাতীয় বিষয়ে একটি বক্তব্য। যেখানে উনি যা বলেছেন, ৩০ তারিখের নিবন্ধে, জহরবাবুও প্রায় তাইই বলেছেন । একইসঙ্গে সাহিত্য না পড়ার জন্য, বাংলা বলতে ভুলে যাবার জন্য, বৌদ্ধিক জীবনের প্রতি ঔদাসীন্যের জন্য অধুনার বাঙালি প্রজন্মকে দুষেছেন, আবার বকলমে অর্থনৈতিক সাফল্যের জন্য এবং স্কচ ও সোডা খাবার জন্য প্রশংসাও করেছেন।

তো? আসলে ইদানীং এই কথাগুলো বড় বেশি ঘুরছে আমাদের আশেপাশে। এদিকে ওদিকে ক্রমাগত শুনতে পাই যে, বাঙালির অস্তিত্ব বিপন্ন, বাঙালির সংরক্ষণ জরুরি। বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতি যেতে বসেছে। সেটা এক বিলীয়মান বস্তু। এই যে আমাদের শোনা আর ক্রমাগত বলে যাওয়া, ক্রমাগত কেঁদে কাকিয়ে বলে চলার মধ্যেও কি এক আত্মকন্ডুয়ন নেই, প্রবল? বিশেষত, বাঙালির ভাষা সংস্কৃতির জন্য আমরা জনগণ যারা কিছুই প্রায় করছি না, সমসময়ের স্রোতে ভেসেই চলেছি, তাদের মুখে এই ধরণের কথা একধরণের লিপ সার্ভিস ছাড়া আর কিছুই কি?

নানাভাবে এই কথাগুলো আপাতত আমাদের ভাবনাবিশ্বকে যখন উশকে রেখেছে, বারে বারে ই বদলে যাওয়া বাঙালির এই বদলের রকম সকম আসলে ভালো, না খারাপ, বাঙলা, বাঙালি সংস্কৃতি ও বাঙালির আইডেন্টিটি বিপদের মুখে, না কি উদ্দাম সাফল্যের দিকে ধাবমান, এই আলোচনা যখন চায়ের কাপে, থুড়ি ক্যাপুচিনোর মাগে তুফান তুলছে, বারে বারেই  এক দল বয়স্ক বাঙালি যখন “সব গেল” রব তুলছেন ও একদল তরুণ বাঙালি যখন নিজেদের বাঙালিয়ানাকে তথাকথিতভাবে ভুলতে উদ্যত, তখনই, পর পর কয়েক মৃত্যু আবারও এই সব প্রশ্ন তুলে দিয়ে গেল।

এই আদর্শবাদ, আমরা লক্ষ্য করব নষ্ট হতে শুরু করে আশি-নব্বইয়ে এসে। কেননা, ছেলেমেয়েদের বিদেশে পাঠানোটা তখন হয়ে ওঠে একমাত্র লক্ষ্য। কে কত ‘ব্রিলিয়ান্ট’ তা মাপা হতে থাকে কে কত বড় বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে তার ওপর। আইভি লিগ বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ছেলেমেয়েকে পাঠিয়ে দিয়ে বাবা মায়ের নিশ্চিন্ত একাকী নিঃসঙ্গ জীবন, এই নিয়ে এরপর সেন্টিমেন্টাল সিনেমা তৈরি শুরু হবে, সেটাও ওই ১৯৯০-২০০০।

২০১৮ ডিসেম্বরে দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী , মৃণাল সেনের মৃত্যু, ২০১৯ এর শুরুতে দিব্যেন্দু পালিতের মৃত্যু,  আমাদের প্রজন্মকে, যাদের বয়স ৫০ এর এদিকে ওদিকে, একভাবে অনাথ করে গেল যেন। কোথায় যেন মাথার ওপর থেকে মহীরূহ সরে যাবার অনুভব এল। মনে পড়ে গেল, আর কয়েক মাস আগেই গিয়েছেন রমাপদ চৌধুরী, গিয়েছেন অশোক মিত্র …এঁরা যেন ছিলেন বাঙালির যা কিছু ভাল, তার প্রতীক… মননশীল, ইন্টেলেকচুয়াল, সংস্কৃতিসম্পন্ন, আদর্শবাদী, সৎ ও শিরদাঁড়াসম্পন্ন বাঙালির প্রতীক,  এক কথায় যাকিছুকে আমরা বাঙালিত্ব বলে ভাসাভাসা ভাবে ভাবতে পছন্দ করি, তার প্রতিভূ বা প্রতীকস্বরূপ। এইসব মৃত্যু আরও একবার মনে করিয়ে দেয় যে বাঙালির সাহিত্য, শিল্প, সিনেমা গান কবিতার জগতের প্রাজ্ঞ পিতামহরা প্রায় সবাই চলে গিয়েছেন। দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যু মনে পড়ায় বহু পূর্বে অকালে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুর কথা। ঠিক যেভাবে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর মৃত্যু মনে আনে,  সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বা বাদল বসুর মত ব্যক্তিত্ব, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যুকে। সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত, তারাপদ রায়ের মৃত্যুকে। গোটা একটা তাক খালি হয়ে যাবার অনুভব।

যেন, একে একে নিবিছে দেউটি। বাঙালির তথাকথিত  ঋদ্ধতার গৌরবের সবটুকুই ত এমনিই যেতে বসেছে… এখন প্রতীকী কাজটাও সম্পন্ন। শেষ প্রদীপগুলো একে একে নিভিয়ে দেওয়া!

মৃত্যু কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। মৃত্যু ক্রমাগত ঘটেই চলে, জন্মের মতো অবধারিত সত্যি বলেই তাকে মেনে নিতেও হয় অবধারিতভাবেই। তবু তা আমাদের বিষণ্ণ করে, সাময়িকভাবে আমাদের অবশ করে দেয়। নিঝুম করে দেয় শ্মশান বৈরাগ্যে। আর এইসব সময়েই ওই প্রশ্নগুলো বিক্ষত করে আমাদের। বাঙালি কি সত্যি মৃতপ্রায় এক জাতি? আত্মবিস্মৃত, যেমন বলেছিলেন বহু আগে, নীরদ সি চৌধুরী? বাঙালি কি তার ভাষা ও সংস্কৃতিকে সত্যি হারিয়ে ফেলেছে? এ কথা কিন্তু শ্মশান বৈরাগ্য নয়। এটা আসলে এক সার্বিক হতাশার ফল।

বদলে যাওয়া সময়ের , বদলে যাওয়া সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে নিতে আমরা, সেই ৫০ এর আশেপাশে যারা, তারা এবার দেখছি, পায়ের তলার মাটিই সরে যাচ্ছে। একইসঙ্গে আমরা নিজেরাই মেনে নিয়েছি মানিয়ে নিয়েছি ডিজিটাল যুগের সঙ্গে, নিউক্লিয়ার পরিবারগুলোর সঙ্গে, সব রকমভাবেই আমরা কীরকম যেন পুরনো চিহ্নগুলো হারাচ্ছি।আমাদের পরবর্তী  প্রজন্মের চাওয়া পাওয়াগুলো আলাদা, তাদের কাছে সিম্পল লিভিং হাই থিংকিং অর্থহীন।

ইদানীং , পৃথিবীর  অন্য অনেক সংস্কৃতিই যেভাবে মার্কিন সংস্কৃতির আঘাতে বিপর্যস্ত, আন্তর্জাতিক স্তরে মার্কিন হেজিমনির বার্গার সংস্কৃতির মনোকালচারিং এ ভারতীয় তথা বাঙালিও সমপরিমাণেই আহত এটা তো মানতেই হবে। অন্যদিকে মানতে হবেই যে, ভারতের অনেক প্রদেশের মধ্যে একটি প্রদেশ তার ভাষা ও সংস্কৃতিকে ধরে রাখতে গিয়ে আহত হচ্ছে প্রতিহত হচ্ছে মূল ধারার অতি ক্ষমতাময় ও অর্থপ্রাবল্যে ডমিনেটিং পরিস্থিতিতে থাকা হিন্দির আগ্রাসনের দ্বারা। ইংরেজি আর হিন্দি এই দুই ভাষার সাঁড়াশি আক্রমণে,  বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলের মধ্যে বড় বড় শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে যে, একথা তো অনস্বীকার্য।

আমি দেখেছি আমাদের প্রজন্মকে, একটা সরু রেখার দুদিকে পা রেখে দাঁড়িয়ে থাকতে। এক দিকে রয়েছে এক অতীত, ঐতিহ্য, বাঙালির অহংকার সমূহ। ১৮০০ থেকে ১৯০০ যদি ধরি রেনেসাঁস, ইংরেজি পড়া বাঙালির নতুন আত্মপরিচয়ের খোঁজ নেওয়া আর নিজেকে তৈরি করা, দেশাত্মবোধের জাগরণে আদর্শবাদী হয়ে ওঠার পর্ব, তবে আসলে আমরা যে বাংলা কালচারের গৌরব করি তার শুরু ১৮৬১ তে রবীন্দ্রনাথের জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই শুরু, তবু তার সার্বিক ফললাভ হয়ত বা ১৯৩০ থেকে ১৯৯০ অব্দি কাল খন্ডেই আবদ্ধ থাকবে।

শ্রী চন্দ্রিল বলেছেন, বাঙালি অর্থকরী বিষয়কে নিচু চোখে দেখত। মোটা মোটাভাবে দেখলে অবশ্যই তাই। কিন্তু এই যুক্তিতেও ছ্যাঁদা আছে। বাঙালিই ব্যবসা করতে পটু ছিল একদা, বড় বড় কাঠের বহিত্র নির্মাণ করে বঙ্গোপসাগরের বুকে ভাসিয়ে পূর্ব দেশে ব্যবসা করত। ক্ষুরধার বুদ্ধি বাঙালিই আরবি ফারসি শিখে নায়েবগিরি করে, গোমস্তার কাজ করে, হিসাব রক্ষকের চাকরি করে জমিজমা করত। ব্যবসা বুদ্ধি , অর্থ গৃধ্নুতা, ঝানু বা পাকা মাথার বৈষয়িক বাঙালির কথা আমরা ইতিহাস বা প্রাচীন উপন্যাসের পাতা খুললেই পাব।

এই ষাটটা বছর ধরে, বাঙালির শ্রেষ্ঠত্ব, বাঙালির আত্ম অহংকারের নানা চিহ্ন তৈরি হয়ে উঠবে।আমার মতে আমরা যে বাঙালি গেল গেল করে কাঁদছি,  সে বাঙালি আসলে একটা ছোট্ট পর্ব, ১৯৩০ থেকে মোটামুটিভাবে ১৯৯০ এই পর্বের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালি। রাজনীতি সাহিত্য সংস্কৃতির পথে এগিয়ে থাকা বাঙালি।

আমরাই তো সে পরের প্রজন্ম। আমরা কি নিজেদের মানিয়ে নিইনি এই সব অতি মেটিরিয়ালিস্টিক জগতের সঙ্গে?

কেন বলছি ১৯৩০ থেকে ১৯৯০? এই কালখন্ড কেন গুরুত্বপূর্ণ? আসলে যুগন্ধর পুরুষরা, যাঁরা সমাজ সংস্কারক, তাঁরা তার আগে অব্দি আমজনতা বাঙালির কাছে গ্রহণীয়ই ছিলেন না সেভাবে। যেকোনও সংস্কারের গুরুতর কাজ খুব দুরূহ হয়ে থাকে। বিধবাবিবাহ চালু করা বিদ্যাসাগরকে তাই চলে যেতে হয় কারমাটারে। রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্য অথবা গান সীমাবদ্ধ থাকে এলিট সমাজের মধ্যে। আমার দিদিমার মুখে শুনেছি ১৯২০ নাগাদ রবি ঠাকুরের গান প্রায় কেউ গাইতই না, ব্রাহ্ম পরিবার অথবা আমার দিদার মতো আলোকপ্রাপ্ত হিন্দু মহিলা পুরুষেরা “রোববাবুর গান” নিজেদের মতো গাইতেন, শুনতেন গ্রামাফোনে। সার্বিক স্বীকৃতি পেতে পেতে সেই ত্রিশ বা চল্লিশের দশকের জন্য অপেক্ষা।

যতদিনে রবীন্দ্রনাথের মতো সূর্য বাংলার আকাশে স্থির হয়ে এসেছেন বলে মনে হয়, ততদিনে রবীন্দ্র প্রতিস্পর্ধী বা তথাকথিত রবীন্দ্রবিরোধী, নতুন কবিতার ঢেউ আসছে। ত্রিশের কবিদের হুলুস্থুল যে আন্দোলন বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ দাশ, অচিন্ত্য সেনগুপ্তদের মতো মহারথীদের হাত ধরে ঢুকেছিল বাংলার সংস্কৃতিমঞ্চে, সেই কল্লোলের বিভঙ্গ সেই মুহূর্তে কতখানি স্বীকৃত ছিল? তখন তাকে দেখা হয়েছিল এক ধরণের আক্রমণ হিসেবেই। রবীন্দ্রনাথ -পন্থী সজনীকান্তরাই তখন মেইনস্ট্রিম বা মূল ধারা। তাঁরা কল্লোল কবিদের প্যারডি বানিয়ে বিরোধিতা করে নানাভাবে কুৎসা করে বাজার গরম করেছেন।

ত্রিশের এই ঢেউ পেরিয়ে আসেন নীরেন্দ্রনাথের মতো কবিরা। চল্লিশের বামপন্থী সমাজবাদী মানবতাবাদী কবিকুল বিষ্ণু দে, সুধীন দত্তের পদাঙ্ক অনুসারী হয়ে বাংলার সংস্কৃতি মানচিত্রকে আলোকিত করছেন।

এর পর পর আসবে পঞ্চাশের ঢেউ। সমাজবাদের পর আবার আত্মমুখী, ব্যক্তিস্বাধীনতার আত্মমগ্নতা আসবে স্বীকারোক্তিমূলক কবিতার হাতে।

এই যে ত্রিশ চল্লিশ পঞ্চাশের কথোপকথনটি চালু আছে, এই প্রশ্ন তোলার, প্রতিবাদ করার স্পিরিটটাই বোধ হয় বাঙালির যে বস্তুটি চলে যাবার জন্য আমাদের দুঃখ হচ্ছে।

বাঙালির কী কী ছিল বা পেয়েছি আমরা লক্ষণ হিসেবে, তাকে একবার দেখা যাক-

Kolkata

ক) প্রতিবাদী সত্তা

বাঙালির অতি সম্প্রতি যা খোয়া গেছে তা হল শিরদাঁড়া। এই যে ওপরে বললাম, কবিতার জগতের প্রগ্রেশনটাই লক্ষ করলে আমরা দেখতে পাব যে প্রতি দশ বছরে বাঙলা কবিতা আবার নতুন ছাঁচে ঢেলে লেখার চেষ্টা হচ্ছিল। অর্থাৎ পূর্বে যে যা করেছেন, সেই সব উত্তরাধিকারকে প্রশ্ন করার হিম্মৎ এই কবিরা দেখাতে পারছিলেন। নতুন নতুন খাতে লেখাকে বইয়ে দিতে চাওয়ার মধ্যে স্পষ্ট এই অ্যাজেন্ডা। নতুবা রবীন্দ্রনাথের মত বিশাল জ্যোতিষ্ক বর্তমানে বুদ্ধদেব বসুদের কল্লোল যুগ আনয়নের স্পর্ধা অভাবনীয়ই এক রকমের। এবং এঁরা প্রায় সকলেই জীবনের শুরুতে রবীন্দ্রপাঠকেই নিজেদের চিত্তভূমি গড়া কাজে লাগিয়েছেন।

তবু লেখার সময়ে রবীন্দ্রবিরোধিতা করতে, বা রবীন্দ্র কলমকে এড়িয়ে , অনুকরণ এড়িয়ে অন্য কিছু লিখতে এঁদের উৎসাহ হয়েছিল।

এই প্রকৃতিগত অ্যাডভেঞ্চার প্রবণতাই বাঙালির রাজনীতির ক্ষেত্রেও দেখা গেছে। নতুন মতাদর্শ ভাবাদর্শ বাজিয়ে নিতে চেষ্টা করেছেন বাঙালি, যুক্তি দিয়েছেন, বিতর্ক করেছেন। কখনও বা বিতন্ডাও। কিন্তু নতুন ধারা কেটে বেরিয়েছে, নতুন ভাবনার জন্ম হয়েছে। এভাবেই তৈরি হয়েছে আন্দোলনের জমি।

ঠিক সেভাবেই সমাজ মনস্ক চলচ্চিত্রের যেসব তাবড় নাম আমরা এক নিশ্বাসে বলে ফেলি তাঁরাও নিজেদের পূর্বসূরীদের সমালোচনা করতে করতেই এগিয়েছেন। সত্যজিতের তীক্ষ্ণ তুখোড় খুঁতখুঁতেপনা, ঋত্বিকের অনমনীয়তা অথবা মৃণাল সেনের সাহসী ছবি বানানোর গল্পকথা। তপন সিংহের জনপ্রিয় সিনেমার বয়ানও সমসময়ের মধ্যবিত্ত মানসিকতাকে ফালাফালাই করেছে।

নিজের সময়কে, নিজের পূর্বসূরীদের প্রশ্ন করার সাহস দেখাতে পারার জন্য যে শিরদাঁড়া লাগে, তাকেই আমরা অনন্য বলে চিনেছি। কিন্তু এও ভাবতে হবে যে এই মানুষদের সংখ্যা সে যুগেও হাতে গোনা ছিল। হয়ত শেষ পর্যন্ত গড্ডলিকাপ্রবাহটিকে তাঁরা সচেতনে খারিজ করতে চেয়েছেন। বহুর আড়াআড়ি অল্প সংখ্যক দাঁড়িয়েছেন। বহু কোনওদিনই এদের এক ডাকে চিনতে পারেনি। চিনিয়ে দিতে হয়েছে। স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দেওয়া ছেলেমেয়ের তুলনায় , ঘরে বসে ভয়ে কাঁপা মানুষের সংখ্যা নিশ্চিতভাবে বেশি ছিল, যেমন সূক্ষ্ম শিল্পের প্রাইমার তৈরি করা সত্যজিতকে বা শম্ভু মিত্রকে বোঝার জন্য যে দর্শক রুচি তা একদিনে তৈরি হয়ে ওঠেনি। ধীরে ধীরেই তৈরি হয়েছে।

খ)  আদর্শবাদ, দার্শনিকতা, সিম্পল লিভিং, অর্থ অমনস্কতা

শ্রী চন্দ্রিল বলেছেন, বাঙালি অর্থকরী বিষয়কে নিচু চোখে দেখত। মোটা মোটাভাবে দেখলে অবশ্যই তাই। কিন্তু এই যুক্তিতেও ছ্যাঁদা আছে। বাঙালিই ব্যবসা করতে পটু ছিল একদা, বড় বড় কাঠের বহিত্র নির্মাণ করে বঙ্গোপসাগরের বুকে ভাসিয়ে পূর্ব দেশে ব্যবসা করত। ক্ষুরধার বুদ্ধি বাঙালিই আরবি ফারসি শিখে নায়েবগিরি করে, গোমস্তার কাজ করে, হিসাব রক্ষকের চাকরি করে জমিজমা করত। ব্যবসা বুদ্ধি , অর্থ গৃধ্নুতা, ঝানু বা পাকা মাথার বৈষয়িক বাঙালির কথা আমরা ইতিহাস বা প্রাচীন উপন্যাসের পাতা খুললেই পাব।

আসলে এখানেও আছে ওই ১৯০০ পরবর্তী, বিংশ শতকের বিশ ও ত্রিশের দশকের খেলা। তার আগে জ্ঞানচর্চা ছিল তথাকথিত রুপোর চামচ মুখে নিয়ে আসা জমিদারদের কাছেই সুলভ। রবীন্দ্রনাথের লিনিয়েজ দেখুন। দ্বারকানাথ-দেবেন্দ্রনাথের মতো জমিদারদের পরিবার থেকেই জন্ম নিল সংস্কৃতির রাজপুত্র। তাঁরা কি গরিব ছিলেন? এমন কি রবি বাবুর আত্মজীবনী স্মৃতিকথা “জীবনস্মৃতি”তে ছোটবেলায় মাত্র দু খানা সাদা কাপড়ের জামা থাকার কথাও তো অপ্রমাণ হয়েছে ঠাকুরবাড়ির হিসেবের খাতা পরীক্ষা করে।

আসলে এক দিকে পরাধীন ভারতে বাংলার ধনসম্পত্তির ক্রমাগত দোহন, ইংরেজদের শোষণের ফলে বাংলার অর্থনীতি যখন ফুটো হয়ে যাওয়া পাত্রের মতো ক্রমাগত ইন্ধন হারাচ্ছে, এবং  দুর্ভিক্ষের একের পর এক আঘাত থেকে বেদনার্ত ক্ষুধার্ত হচ্ছে, তৎপরবর্তী বৌদ্ধিক ক্রিয়াকলাপের মধ্যে দিয়ে বাঙালি হয়ে উঠল একদিকে গরিব, হা-ভাতে, কৃপণ, ও প্রবলভাবে আর্থিকভাবে অনিশ্চিতির শিকার। এই রূপটা আরও তীব্র করে দিল দেশভাগ পরবর্তী বাংলা সংকট।

বাঙালির প্রাণকেন্দ্র কলকাতা বা ঢাকাতে, বাঙালির হাত থেকে অর্থ প্রতিপত্তির রাশ অল্প অল্প করে চলে যেতে লাগল মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীদের হাতে। ব্যবসায়ী বলতেই  কালোবাজারি হয়ে গেল, ধনী অনুদিত হল দুর্জনে। এটা পুরোটাই বিংশ শতকের ক্রাইসিস নয় কি?

ফলত, বাঙালির বৌদ্ধিক অগ্রসরণ হয়ে গেল “অর্থ অমনস্ক” … বা টাকাপয়সা সম্পর্কে ঔদাসিন্যকেই তুলে ধরা হয় আদর্শবাদ হিসেবে।

কিন্তু টাকাপয়সা নিয়ে ঔদাসিন্য মানেই কিন্তু অর্থনীতি বা অর্থনৈতিক সত্য অসত্য-বাস্তবতা-অবাস্তবতা সম্বন্ধে ঔদাসিন্য নয়। বরঞ্চ বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের কলমে অর্থ ব্যবস্থার আঁকবাঁক বার বার উঠে এসেছে । সুবোধ ঘোষের গল্পে (চিত্তচকোর) দামি অফিসারের সঙ্গে মেয়ের  বিয়ে দিতে চাওয়া বাবা মা যখন মেয়ের পছন্দের ছেলেটি যখন আদতে নিচু তলার কর্মী জানেন,  হতাশ হন। তৈরি হয় ভালবাসা বনাম টাকাকড়ির স্টিরিওটাইপ। পরে যা বারে বারেই আসবে চলচ্চিত্রে, নাটকে, গল্পে।

শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষুরধার দৃষ্টি শুধু ব্যোমকেশের গল্পে না, নানা অন্য ছোটগল্পেও প্রমাণ রেখেছে “অর্থমনর্থম” নামক সমস্যাটির। টাকাপয়সার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী জড়িত অপরাধজগত, তাই সে তো স্বাভাবিকই। তবু ব্যোমকেশ অতি সাধারণ ঘরের ছেলে ও সত্যবতী এক আপাত কালিমাময় চালচিত্র থেকে উঠে আসা বাপ মা হারা মেয়ে, সুতরাং লেখক ধনতন্ত্রের বিপরীতেই নিজের সহানুভূতি রাখেন।

অর্থনীতি নিয়ে দুর্দান্ত স্যাটায়ার বারংবার রেখেছেন এক অসামান্য ক্ষুরধার মেধাবী লেখক। পরশুরাম। পরশুরামের লেখায় হিসেব-পত্তরের, ভুয়ো ব্যবসা, লোকঠকানো অর্থহাতানোর স্কিমের গল্প আছে। আছে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের গল্প। আছেন ‘ তিনে কত্তি তিন ‘ লেখা বড়বাবু আর গন্ডেরিরাম বাটপাড়িয়ারা। সোনার বাজারের ওঠাপড়া নিয়ে পরশপাথরে পরশুরাম যে খেলা দেখিয়েছিলেন তা অর্থকরী বিষয়ে বাঙালির ঔদাসীন্য প্রমাণ করে না, প্রমাণ করে অর্থ নিয়ে মাতামাতি যে ইতিমধ্যে বুদ্ধিমান লোকেদের চোখে একরকমের পাগলামি বা হাস্যকর ক্রিয়া, সেই দৃষ্টিভঙ্গির তফাতটুকুই।

বুদ্ধদেব বসুর পাঠক প্রসাদ পাওয়া উপন্যাস তিথিডোর। মারাত্মক জনপ্রিয় প্রেমের গল্প হলেও, বাঙালির তিন রকম স্টিরিওটাইপ পুরুষের পরিচয় এখানে পাই। নির্মাণ হয়ে উঠছে বাঙালির পরিচয়।

তিন পুরুষ চরিত্র। রাজেন বাবু আর সত্যেন রায়। দুই প্রধান পুরষচরিত্র কোথাও যেন আলাদা হয়েও এক। রাজেন সত্যেনের ভালোত্ব, এবং বাঙালির মধ্যবিত্ত, মেধাবী, ধনলোভহীন, প্রতিপত্তিলোভহীন চরিত্র যেমন এক রঙে বোনা, এবং বু বর নিজস্ব কন্ঠস্বরে চোবানো, বলা চলে প্রোটাগনিস্ট চরিত্রই। কিন্তু তবু, এ দুই চরিত্র বড্ড একরঙা। রাজেনবাবুর আলোয়ানের মতো ঘষা ঘষা, বাদামি, রোঁয়া ওঠা। আদর্শ ভদ্রলোক বাঙালির এই ছবি ভেঙে ভেঙে দেয় যে আয়নায় প্রতিসরিত হয়, সেই আয়না ভিন্নধর্মী  পুরুষ চরিত্র এই তিথিডোরে। আকর্ষণীয় চরিত্র হারীত নন্দী। বিদেশ ফেরত, স্মার্ট, ইংরেজি বুলিতে চৌকশ, তথাকথিত কমিউনিস্ট, প্রচন্ড চরিত্র। আপাত হৃদয়হীন। দু’স্তরে এর স্ববিরোধ। কমিউনিস্ট হিসেবে সোচ্চার হলেও এ লোভী কৃপণ সুযোগ সন্ধানী এবং মানুষের প্রতি সচরাচর এমপ্যাথিহীন। আর মেয়েদের তথাকথিত স্বাধীনতার বুলি কপচেও হারীত তার স্ত্রী শাশ্বতীকে পুরুষসুলভ ডমিনেশনেই রাখে। জ্ঞান বিদ্যা এবং সর্বোপরি ইজমের অহং দিয়ে চেপে দিতে চায়, ফুটে উঠতে দেয় না শাশ্বতীকে কিছুতেই।

তৃতীয় ধরণের চরিত্র রবীন মজুমদার। প্রথমে যে নেগেটিভ, একেবারে প্রায় যেন ভিলেন চরিত্রই। উর্ধগামী ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট। মেধাবীর থেকে বেশি কৌশলী।  মজুমদারের আছে টাকা ও মাসল পাওয়ার। কাহিনির প্রথম দিকে যা প্রায় বিপজ্জনকভাবে ক্রিয়াশীল। স্বাতীকে ‘হাশিল” করতে চাওয়া মজুমদারের হাত ধরে কলকাতার ধন তান্ত্রিক ডিটেলিং এসেছে। রাজনীতির ডিটেল যেমন হারীতের হাত ধরে, বাঙালির মানসপটের রাজনীতি চেতনা যেমন হারীতের হাত ধরে। পার্ক স্ট্রিট, নিউ মার্কেট, গ্লোব, নিউ এম্পায়ার সিনেমা। চাং ওয়াহ চিনে রেস্তরাঁ, সন্ধ্যার  বিলাসী, রমণীয়, ধনী, অতি শৌখিন কলকাতা, কনজিউমারিজমের প্রথম উদবোধন, সবই মজুমদারের হাত ধরে। মজুমদারের শৈশবের বর্ণনাও চিত্তাকর্ষক এবং পথপ্রান্ত থেকে উঠে আসা র‍্যাগস টু রিচেস এর গল্পটা চমৎকার বুনে তোলেন বুব। শেষ দৃশ্য অব্দি ক্রিয়াশীল থাকে এই তিনস্টিরিও টাইপের পুরুষ চরিত্র।

ওপরের এইসব বিশ্লেষণ থেকে কী পাওয়া গেল? এইই, যে বাঙালি টাকা করাকে  ঘৃণা করে, এটা বোধ হয় কোনওকালেই সত্য নয়। অর্থবানদের ঈর্ষা অবশ্যই করে, অথবা আড়চোখে মেপে দেখে ধনীদের। কিন্তু বাঙালি মধ্যবিত্তের চরিত্র রাজেনবাবু আর সত্যেন হতে চেয়েছে। কিন্তু আশেপাশে মজুমদারের মতো চরিত্রের মোটেই কোনও ঘাটতি কোনওদিন ছিল না। তাদের নিজেদের বৌদ্ধিক চর্চার অহংকারে, একটু নিচু করে দেখতে বাঙালি শিখেছে বুদ্ধদেব বসুর মতো ইন্টেলেকচুয়ালের হাত ধরেই। বিদ্যাচর্চাকে উঁচু আসনে বসানোর স্ববিরোধ, বা হিপোক্রেসি বাঙালি এভাবেই আয়ত্ত করেছে। আরেকটা হিপোক্রেসি এই যে, বাঙালি মধ্যবিত্ত তথাকথিত অর্থ গৃধ্নুতাকে ঘৃণা করেও যথেষ্ট কৃপণ ছিল ও আছে। এবং সে, অন্যকে টাকা দিতে ভালবাসেনি কোনওকালে। তাই ডাঞ্চিবাবুরা পশ্চিমে গিয়ে থ্রো অ্যাওয়ে প্রাইসে, মাটিকাঁকড়ের দামে “অশিক্ষিত” গ্রামীণ জনজাতির থেকে জিনিস কিনতে চেয়েছে, ভাড়ার এক টাকা কমানোর জন্য রিকশা ওয়ালার সঙ্গে ঝগড়া করেছে, স্টেশনের কুলিকে “তং মত করো, কাফি হো গিয়া বহুত হো গিয়া” বলেছে,  সব্জিওয়ালাকে টোটাল থেকে দশ বিশ টাকা ছেড়ে দিতে বলেছে, পাড়ার বা রাস্তার ধারের দোকানে দরাদরি করেছে,  খবরের কাগজ ওলাকে ছেঁড়া কাগজ বিক্রির সময় পাল্লাটা সমান হয়নি কেন, তা নিয়ে কিচকিচ করেছে।চন্দ্রিল কথিত সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব,  যাদের টাকাপয়সা নিয়ে মাথাব্যথা নেই, জীবন সম্বন্ধে অত্যন্ত দার্শনিক, অর্থ নিয়ে উদাসীন এক বিশাল হৃদয় বক্ষপঞ্জরে ধকধক করে, তাদের তো এটা মানায় না।

পুরুষ বাঙালির মতো মহিলা বাঙালি আরও বেশি বেশি করেই এইসব কার্পণ্য করেছে। নিজের থেকে বেশি ধনীদের সঙ্গে পেরে না উঠে,  বাঙালি এইসব “গরিবদের” সঙ্গে দরদাম না করে ভাত খায় না।

ইদানীং উচ্চবিত্ত হবার জন্য লালায়িত বাঙালি তো আরও অদ্ভুত। প্রতি মাসে নতুন জামাকাপড় কেনেন। দরদাম করেন? শপিং মলে, সিসিডিতে, বড় বড় রেস্তোরাঁয়, দরদাম করেন না।  যত দরদাম শুধু গরিবদের সঙ্গেই করতে হয়, মনে হয়ে ওরা আমাদের ঠকিয়ে বড়লোক হয়ে যাচ্ছে। নিম্নবিত্তরা কিন্তু কোনওদিন বড়লোক হতে পারে না, কেননা আমাদের মতো মধ্যবিত্তদের চাপের কাছে ওরা মাথা নত করে, শেষ পর্যন্ত ডিস্ট্রেস সেল করতে বাধ্য হয়। অথবা খারাপ মাল দিয়ে নিজের দাম কমানোটা পুষিয়ে নেয়,  আসলেই বাঙালি ঠকে যায়।

তবে হ্যাঁ, লেখাপড়া, বিদ্যা ও জ্ঞানের চর্চা, এইসবকে মূল্য দেওয়ার শুরু যদি হয়ে থাকে নবজাগরণের সময়ে, উনিশ শতকে, তবে বিশ শতকে এসে এই বিদ্যার্জনের প্রয়োজনীয়তা শুধু অর্থকরী কারণ ( ভাল চাকরি পাওয়া, ইংরেজের যোগ্য কেরাণি হয়ে ওঠা ইত্যাদি আপাতদৃষ্টিতে লোভনীয় হাতছানি) ছাপিয়ে একধরণের প্যাশনে পরিণত হল। বিজ্ঞানসাধনার মানুষগুলির জীবন তো তাই বলে। প্রফুল্লচন্দ্র রায়, জগদীশচন্দ্র বোস মেঘনাদ সাহার জীবনের কাহিনি সেভাবে পড়ে নিতে পারি আমরা, অথবা দেখতে পারি পরবর্তী প্রজন্মের বিজ্ঞান শাখার অতি হীরকদ্যুতি মন্ডিত ছাত্রদের যাঁরা বিদেশে গিয়ে নিজেকে প্রমাণ করলেন আবার দেশে ফিরে সহজ বাংলায় বিজ্ঞানের বই ও লিখলেন, এদের কাছে বিজ্ঞানও ছিল সমাজবাদের একটা হাত। রাজনৈতিক মতাদর্শে এদের অনেকে হয়ে উঠলেন বামপন্থী, আর মানুষের জন্য বিজ্ঞানকে ব্যবহারযোগ্য করার দায় নিজেদের হাতে তুলে নিলেন।

এই আদর্শবাদ, আমরা লক্ষ্য করব নষ্ট হতে শুরু করে আশি-নব্বইয়ে এসে। কেননা, ছেলেমেয়েদের বিদেশে পাঠানোটা তখন হয়ে ওঠে একমাত্র লক্ষ্য। কে কত ‘ব্রিলিয়ান্ট’ তা মাপা হতে থাকে কে কত বড় বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে তার ওপর। আইভি লিগ বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ছেলেমেয়েকে পাঠিয়ে দিয়ে বাবা মায়ের নিশ্চিন্ত একাকী নিঃসঙ্গ জীবন, এই নিয়ে এরপর সেন্টিমেন্টাল সিনেমা তৈরি শুরু হবে, সেটাও ওই ১৯৯০-২০০০।

লেখাটি সম্পূর্ণ নয়। বাঙালির স্টিরিওটাইপগুলো নিয়ে আরও লিখব, ইচ্ছে আছে।