শিক্ষাঙ্গনে পিতা-পুত্রের যথাযথ যুগলবন্দির ইতিহাস সারা দেশে বিরল হলেও এরকমই একটি ঘটনার সাক্ষী বহন করে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ। বিদগ্ধ, গণিতজ্ঞ, পদার্থবিদ, দুঁদে আইনজ্ঞ হিসেবে স্যার আশুতোষ মুখার্জীর পরিচয় সকলেই জানেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় তাঁর প্রকৃত উত্তরসূরী, সুযোগ্য মধ্যমপুত্র ভারতকেশরী ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর শিক্ষাক্ষেত্রে অনস্বীকার্য অবদান আজ বাঙালী ভুলতে বসেছে।

১৯০১ সালের ৬ই জুলাই তৎকালীন ৭৭ রসারোডের (অধুনা ৭৭ আশুতোষ মুখার্জী রোড) বাসভবনে জন্ম নিয়েছিলেন এই কিংবদন্তি। ২৩শে জুলাই ১৯০৬, মাত্র পাঁচবছর বয়সে ভর্তি হন মিত্র ইনস্টিটিউশনের ভবানীপুর শাখায় দ্বিতীয় শ্রেণিতে। তৎকালীন সময়ে তাঁর শিক্ষকের (যিনি পরবর্তীকালে মিত্র ইনস্টিটিউশনের এই শাখার প্রধান শিক্ষকও হয়েছিলেন) বর্ণনা অনুসারে তাঁর স্কুলে ভর্তির তারিখটি পাওয়া যায়। অপর একজন শিক্ষক হর্ষনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বর্ননা অনুসারে, সদাহাস্যমুখী এই ছাত্রটি স্যার আশুতোষের পুত্র, ঘোড়ারগাড়ী করে স্কুলে আসলেও তাঁর মধ্যে সামান্যতম দম্ভ ছিল না, সম্ভবত এই চারিত্রিক উদারতা ও মানবিক উচ্চতা তাঁকে পরবর্তী সময়ে একজন প্রকৃত অর্থেই জননেতা হয়ে উঠতে সহায়তা করেছিল।

আর‍ও পড়ুন: ১৯৪৬ সালে শ্যামাপ্রসাদের করা মন্তব্য কি আজও প্রাসঙ্গিক?

প্রেসিডেন্সি কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অসামান্য কৃতি এই ছাত্রটির বিলেত থেকে বেরিস্টার হয়ে কলকাতায় ফেরার ইতিহাস এই স্বল্প পরিসরে আলোচনার সুযোগ নেই। কিন্তু একজন সফল আইনজীবী হওয়ার সমস্তগুণাবলী থাকা সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনের সারস্বত সরস্বতীর বন্দনাকেই তিনি জীবনের পাথেয় করে চলাকে শ্রেয় মনে করতেন। ১৯০৬-১৯১৪ এবং ১৯২১-১৯২৩ সুদীর্ঘকালীন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থাকাকালীন স্যার আশুতোষ বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু জটিল সমস্যা নিয়ে শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আলোচনা করতেন। সম্ভবত তাঁর সুপ্তবাসনা ছিল একজন দক্ষ শিক্ষাবিদরূপে শ্যামাপ্রসাদ আত্মপ্রকাশ করুক। শ্যামাপ্রসাদও অত্যন্ত স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন এই বিষয়ে মতামত দান করার ক্ষেত্রে। ১৯২৪-১৯৩৮ এই মেয়াদকালে শ্যামাপ্রসাদ সিনেট, সিন্ডিকেট, বহু কমিটি-সহ দু’টি টার্মে (১৯৩৪-৩৮) বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদ তথা উপাচার্য পদটিকে অলঙ্কৃত করেছিলেন। নিয়েছেন একটির পর একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত যা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়-সহ সমগ্র পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষার রূপরেখায় আমূল পরিবর্তন ঘটিয়েছিল। এই নিবন্ধের সংক্ষিপ্ত পরিসরে আমি সেই বিষয়েই আলোকপাত করব।

আরও পড়ুন: দূরদর্শী শ্যামাপ্রসাদ শিক্ষা ও শিল্পের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের আহ্বান জানিয়েছিলেন

তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন বিদ্যালয় স্তরে মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের কোনও বিকল্প নেই। তিনি বিদ্যালয় স্তরে মাতৃভাষায় শিক্ষাদান প্রণালীর প্রবর্তক (তখন বিদ্যালয়গুলিতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ছিল)। বাংলা বানান সংশোধনী কমিটি গঠন, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে কমলা অধ্যাপক রূপে নিয়োগের (যিনি পরবর্তীকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় সমাবর্তন বক্তৃতা দিয়ে ইতিহাস রচনা করেছিলেন) মধ্যে দিয়ে শ্যামাপ্রসাদ নিজের কর্মতৎপরতার পরিচয় দিয়েগেছেন। একে একে হিন্দি, সাঁওতালি, পালি, সংস্কৃত ভাষা শিক্ষার বিভাগ গঠনের সিদ্ধান্তের মধ্যে দিয়ে ভারতীয় ভাষার হৃত সম্পদের পুনঃআহরণের অভিমুখ রচনা করলেন, ক্রমে ক্রমে বিদেশে থাকাকালীন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভ্রমণ করে আধুনিক শিক্ষার যে রূপরেখা তিনি দেখেছিলেন তাঁর পুর্নবিকাশ ঘটিয়েছিলেন নৃতত্ত্ব, ফলিত মনোবিজ্ঞান, ফলিত রসায়ন, ফলিত পদার্থবিদ্যা, শারীরশিক্ষার মতো আধুনিকতম বিষয়ভিত্তিক বিভাগ স্থাপনের মাধ্যমে। ইসলামিক ইতিহাস ও সংস্কৃত বিভাগ স্থাপনের যে সিদ্ধান্ত তাঁর সময় গৃহীত হয়, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রাচীন, আধুনিক ও ইসলামিক ইতিহাসের মেলবন্ধনে ভারতীয় ইতিহাসের প্রকৃত রূপরেখার অনুসন্ধান ও পুনঃনির্মাণ করা। কারিগরি শিক্ষার প্রসারের মাধ্যমে কর্মসংস্থান তাঁর তৎপরতাতেই শুরু হয়। স্নাতকস্তরের কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে শারীরবিদ্যা বিভাগ ১৯৩৭ সালে তাঁর সিদ্ধান্তেই চালু হয়। ১৯৩৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদ থেকে অবসর নিলেও তাই তাঁর মতামত পরবর্তী উপাচার্যদের কাছে (যেমন প্রখ্যাত চিকিৎসক ড. বিধানচন্দ্র রায়) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হত।

আরও পড়ুন: পশ্চিমবঙ্গ ও শ্যামাপ্রসাদ

ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত সহজ সরল, অনাড়ম্বর জীবনযাপনে অভ্যস্ত এই মহান ব্যক্তির প্রসঙ্গে যখন ‘সাম্প্রদায়িকতা’র মতো অত্যন্ত কুরুচিকর তকমা জুড়ে দেবার চেষ্টা হয়, তখন তাঁর প্রতিবাদ ধ্বনিত হওয়াই প্রাসঙ্গিক। তাঁর ব্যক্তিগতজীবনে ধর্মীয় উদারতা সম্পর্কে জানতে তাঁর ব্যক্তিগত চিঠি ও ডায়েরী বিশেষভাবে দ্রষ্টব্য। আজ ১২০তম জন্মজয়ন্তীর প্রভাতে পশ্চিমবঙ্গের জনক ও আধুনিক শিক্ষার স্থপতিকে জানাই কোটি প্রণাম।