উৎপলদাকে প্রথম দেখি  কফি হাউসের দোতলায়। ৯০ এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে কোনও এক  শনিবার।তাঁর সঙ্গে ছিলেন কালীকৃষ্ণ গুহ, প্রশান্ত মাঝি, এবং আরও অনেকে।একটা বেতের চেয়ারে পা তুলে বসে ছিলেন তিনি। আমি আসার পর পরিচয় বিনিময় হল।এক রাউন্ড কফি এল আবার। উৎপল দার পরণে ঢোলা পাজামা ও ফতুয়া,ঘড়ি নেই, মুখে ঈষৎ হাসি।হে, হে, শরীর তো ভালই আছে, তোমরা একেবারে ডাক্তার ধরে নিয়ে এলে।

আলাপ বিশেষ জমল না, বাড়ি ফিরে এলাম।

এর বেশ কিছুদিন পর আবার দেখা অটোমোবাইল ক্লাবে। এবার আমার সঙ্গে ছিলেন এক ও অদ্বিতীয় সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়।ওরাই বলছিলেন, আমি শ্রোতা। কিছুটা পরিচয় হল। তারপর দেখা হবে লেনিন সরণির চেম্বারে। এবার মানসের সৌজন্যে। অধ্যাপক মানস রে  বলবেন জীবনানন্দ দাশ ও মৃত্যু চেতনা নিয়ে। শুনতে এসেছেন, অনিরুদ্ধ লাহিড়ি (চাঁদ দা),হিরণ মিত্র,রাঘব বন্দ্যোপাধ্যায় ও আরও অনেকে।পড়ার শেষে ওর হাতে দিলাম আমার একটা বই “মাঝে মাঝে কার কাছে যাব”।

এক সপ্তাহ পরে ফোনে জানালেন,বইটা পড়েছেন। কিছু কথা আছে। আবার এলেন চেম্বারে। সঙ্গে নিজের একটা বই উপহার হিসেবে।আর একটা ডটপেন ফাউ।যার চারটি কালি। নীল কালি দিয়ে প্রেশক্রিপশন, কালো কালি দিয়ে কবিতা, আর সবুজ ? হেসে বললেন, প্রেমপত্র, লাল দিয়ে কাটাকুটি আর এডিটি়ং।

সেই শুরু তারপর যত্রতত্র…।

উৎপল কুমার বসুর জন্ম কলকাতার ভবানীপুরে ১৯৩৭ সালে। কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ পাঁচের দশকে। ১৯৫৬ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম কাব্যগ্রন্থ চৈত্রে রচিত কবিতা। এরপর একে একে পুরী সিরিজ, আবার পুরী সিরিজ, লোচনদাস কারিগর, খণ্ডবৈচিত্রের দিন, শ্রেষ্ঠ কবিতা, সলমাজরির কাজ, কহবতীর নাচ, টুসু আমার চিন্তামণি এবং আরও অনেক কাব্যগ্রন্থ। কাব্যশৈলী এবং কবিতার কাঠামোর অভিনবত্বে পাঠকের মনে স্থায়ী জায়গা করে নেন। ১৯৬১ সালে হাংরি আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটলে তাতে যোগ দেন। এর ফলে ১৯৬৪-তে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়, যোগমায়া দেবী কলেজের অধ্যাপনার চাকরি থেকে বরখাস্ত হন। ১৯৬৫-তে লন্ডনে গিয়ে বসবাস শুরু করেন। সেখানেই বিবাহ। এই পর্যায়ে কবিতা লেখায় সাময়িক বিরতি ঘটে। দু-দশক পরে কলকাতায় ফিরে আবার কবিতা লিখতে শুরু করেন উৎপল কুমার। ২০০৬-এ তাঁর কাব্যগ্রন্থ সুখ-দুঃখের সাথী-র জন্য লাভ করেন আনন্দ পুরস্কার। পিয়া মন ভাবে কাব্যগ্রন্থের জন্য ২০১৪-তে লাভ করেন সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার। ২০১৫-এ প্রয়াত হলেন কবি।

উৎপল বসুকে নিয়ে এক সন্ধ্যায় আমরা মিলিত হই ওঁর জন্মদিনে। অনেকে এসেছিলেন। অনেক কবিতা পড়েছিলেন সেদিন লেনিন সরণির চেম্বারে।এর কিছুদিন পরে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন।

বাংলা কবিতায় জাড্য নিয়ে খুব আলোচনা হয়েছে এমন নয়। নাচ নিয়ে তো নয়ই।অথচ তিনি অঙ্ক জানতেন। ভূগর্ভস্থ প্লেটের নড়াচড়া থেকে পৃথিবীর কম্পন সব তাঁর পড়ার বিষয় ছিল।শিখেছিলেন গুপ্ত বিদ্যা,নাচশিল্প, বিদেশি নৃত্যের কৃৎকৌশল,চলনভঙ্গিমা।

সেই উৎপল বিলেত থেকে ফিরে চ্যালেঞ্জ জানালেন পুরনো পুরী সিরিজের উৎপল কুমার বসু কে। অধবর্গদের নানান ধরনের কথা শোনা গেল তার লেখায়।তার ভাষা পাল্টে গেছে, বিষয় এখন সাধারণ মানুষের সুখ দুঃখের কথা, তিনি লোচiন দাস কারিগর।

একজন বিজ্ঞানের ছাত্র ও  শিক্ষক উৎপল কুমার বসু স্বভাবকবিত্বের বিরোধী ছিলেন।আবেগ,প্রেম ও লিরিকের দোলা নয় বরং উত্তর ঔপনিবেশিক নিম্ন বর্গের  লোকাচার তার লেখায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। তিনি লিখেছেন  পুরী সিরিজের  লেখা এই কবিতায়—

উৎপল কুমার১/

চপলতা,নুপুরের শব্দ শুনে

ওই কারা এলো

রুপালি শস্যের খোঁজে

ফিরে এলো সমুদ্রতুফান

চপলতা তুমি ছিলে গ্রীষ্ম- শেষে বাদামপাহাড়ে

আদিগন্ত খোলা মাঠে বাদাবনে, সার্কাসতাঁবুতে

নাইটস্কুলে ঘন্টা বাজে শান্ত হও,নিজেকে বোঝাই

প্রগলভতা বাড়ি যাও,

স্বেচ্ছাচার, মানে মানে কেটে পড়ো দেখি

যদি পারো, এইবার, আমাকেও, একা থাকতে দাও।

           ——–