দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে আছে পাড়া
কেবল শুনি রাতের কড়ানাড়া
‘অবনী বাড়ি আছো?’
শক্তি চট্টোপাধ্যায় প্রয়াত অনেকদিন। এমন একটা কড়া দুপুর কাটিয়ে রাত্রির শান্তিতে যখন নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন কবি, ঠোঁটের কোনে নিশ্চয়ই লেগেছিল সকালের হলুদ সূর্যের আভা। শান্তিনিকেতনের লম্বা লম্বা গাছগুলোর ফাঁক দিয়ে বিচ্ছুরিত সেই আভায় চারদিক হয়ে উঠবে হলুদ। না সেটা আর তাঁর দেখা হয়নি। তিনি তখন চলে গেছেন চির ঘুমের দেশে। নিজের জীবনের দুয়ারে এঁটে দিয়েছেন এক কড়া তালা।
কিন্তু সেই দুপুরের কথা আজও আমি ভুলতে পারি না। খেয়ে না খেয়ে আমিও শান্তিনিকেতনে। ইন্দ্রনাথ মজুমদারের সূবর্ণরেখায় ঢুকছি। যেটা আজও শান্তিনিকেতন গেলে দেবালয়। শক্তি দা বেরিয়ে রিকশাতে উঠছেন। পিছন থেকে ডাকলাম- ‘শক্তি দা’। ‘‘আরে তুই? এতক্ষণ আড্ডা দিলাম। আর হবে না। সন্ধ্যায় আয় চন্দনের বাড়ি। আমি যাবো।’’ ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালাম। সঙ্গে তার কন্যা ছিলেন। না, চন্দনের বাড়ি তিনি আসেননি। অনেক খুঁজেছি-এমন কি রামকিঙ্করের পড়ো বাড়িতেও গেছি, নেই। পরের দিন সব শেষ। এখনও মনে হয় চলন্ত লোকটা গম্ভীর গলায় আমাকে ডেকে উঠবে- ‘আরে তুই?’
রাতের কড়ানাড়া শক্তি শুনতে পাচ্ছিলেন। কিন্তু আজকের এই গহীন অন্ধকারে মন ও সময়ের দুয়ার এঁটে সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। তাদের জাগিয়ে দেবে এমন একজন পোস্টম্যানের দরকার। যে একটা কড়া চিঠি অথবা নোটিশ পৌঁছে দেবে ঘরে ঘরে। এই দ্যুলোক ভুলোক ভেদিয়া- খোদার আসন আরশ ছেদিয়া সময়ের আহ্বান হয়ে দাঁড়াবে। গম্ভীর হয়ে বেলালের মতো আজান দিয়ে উঠবে ‘যথেষ্ট হয়েছে- আর নয়, বন্ধ কর লীলাখেলা।’ এবার নতুন খেলা শুরু হবে। ধূসর দিগন্ত বিস্তৃত, বিধবা মায়ের সিঁথির মতো নির্জীব ফ্যাকাসে সময়ের গায়ে লাগানো হবে রঙ। যে রঙে জেগে উঠবে এদেশের আপামর জনগণ, অন্তহীন শ্রমে যাদের পিঠ বেঁকে গেছে, যারা সব অনাচার বন্ধ করার ক্ষমতা রাখে- ঘুমন্ত পাড়া জাগিয়ে তারা নেমে এক্কেবারে রাস্তার মাঝে।

shakti

কত পদ্য লিখেছেন শক্তি- কেউ জানে না। তিনি‍ও কি জানতেন? ভাগ্যিস শেষকালে হাল ধরেছিলেন সমীর সেনগুপ্ত। বাংলা সাহিত্যকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। শক্তি ছিলেন পদ্য বিতরণে একেবারে অকাতর- ভাবতেই পারতেন না ‘কপি’ রাখতে হবে! নিজেকে ‘লিটল ম্যাগাজিনের কবি’ বলে গর্ব করেছেন। তাঁর সম্পর্কে বহু মিথ চালু আছে। খালাসিটোলার নিত্য যাত্রী তিনি। কিন্তু পদ্যের অবয়বে অথবা ছন্দে কোনও টোল পড়তে দেননি। শব্দ’র ব্যবহারে তিনি ছিলেন একেবারেই তাঁর উপমা। তিনিই আবার আল মাহমুদকে বললেন শব্দের জাদুকর। লোকজ শব্দ ব্যবহারে অবশ্য আল মাহমুদের কোনও তুলনা নেই। শক্তি’র মতো স্পর্ধিত কবি বাংলা সাহিত্যে আসেনি। সেই জন্য আমি বারবার তার বাক্যটিই তাঁকে ফিরিয়ে দিই- ‘তুমি চলে গেছো- স্পর্ধা গেছে চলে’। বাক্যটি লিখেছিলেন এক রাজনৈতিক নেতার মৃত্যুতে।
কিছুটা তরল সহযোগে তার সঙ্গে রাত্রের আড্ডা একটা অভিজ্ঞতার ব্যাপার ছিল। কিছুক্ষণ পরে দারুন কণ্ঠে গেয়ে উঠতেন রবীন্দ্র সঙ্গীত। আমার তো মনে হতো সঙ্গীত নিয়ে থাকলেন না কেন? একটার পর একটা। মুখস্থ। ভাবা যায় না। এমন অভিজ্ঞতা অনেকের অনেকবার হয়েছে নিশ্চয়ই। আমার একবারই। বহরমপুরে একজনের বাড়িতে। হঠাৎ রাত্রি ২টায় বলেছিলেন ‘‘চল- মনীশ ঘটকের সঙ্গে দেখা করে আসি।’’ লালদিঘী পর্যন্ত এসে তাঁকে নিরস্ত করা হয়। বহরমপুরের বিখ্যাত রিকশাতে চেপে দারুন আনন্দ পেয়েছিলেন।
আজ তো দেশ দুয়ার এটে ঘুমুচ্ছে। কবি’র কথাটি মেনে কড়ানাড়া হচ্ছে না। শুধু যাদের কড়ানাড়ার কথা তাদের জন্যই সেই অমোঘ উচ্চারণ- ‘কোথাকার তরবারি কোথায় রেখেছ।’ সবার জন্য সব ভূমিকা নয়। তিনি বুঝে গিয়েছিলেন।
আর কোনও কবিকে নিয়ে এত উপকথা (মিথ) বোধ হয় নেই। একমাত্র মির্জা গালিব ছাড়া। গালিব তার প্রিয় কবি ছিলেন। গালিব অনুবাদে মন দিয়ে ছিলেন বন্ধু আয়ান রশিদ খানকে নিয়ে। অনুবাদের কাজটা করেছিলেন বীরভূম জেলায়। লাল পলাশের দেশে শক্তি হয়েছিলেন রঙিন। গালিব অনুবাদ করার সেটাই আসল জায়গা বলে মনে হয়েছিল। তাছাড়া আয়ান রশিদ তখন ওখানেই কর্মরত।
একের পর এক অনুবাদ করছেন-
‘‘আপনার উদাসীনতা সকল সীমা ছাড়িয়ে গেছে,
হে মহীয়সী রানী,
আর কতদিন আমি শোনাবো হৃদয়ের কথা,
আর আপনি বলবেন ‘কী’?
গালিব এবং শক্তি একাসনে যেন বসে গেছেন। এই বীরভূমে’র মাটিতেই তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন আর এক ঈশ্বরকে- তাঁর কিঙ্কর দা। রামকিঙ্কর বেইজ। শক্তিকে তিনি ‘কবি’ বলে ডাকতেন। রামকিঙ্করের কাছে বারবার ছুটে গেছেন। এক অন্য ধারা জীবনের জন্য।
অকালেই শক্তি চট্টোপাধ্যায় চলে গেছেন। মধ্যরাতে নয়, উপস্থিতির সমস্ত কাল জুড়ে বাংলা সাহিত্য শাসন করে গেছেন। তাঁর সমস্ত পাগলামি ভালোবাসায় রূপান্তর করতে পারতেন এক লহমায়। শুধু পদ্য লিখেই হয়ে উঠেছিলেন আমজনতার কাছে ‘সেলিব্রিটি’।
এক কুহক জীবনের মানে খোঁজার কাজে নিজেকে প্রথম থেকে নিয়োগ করেছিলেন। শেষে সেটাই ছিল তাঁর ‘ব্র্যান্ড’। আমরা তাঁর সেই কুহকজাল ছিঁড়তে আজও অপারগ।