১৮০৪ খ্রিষ্টাব্দের ৭ ডিসেম্বর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক ঘোষণা অনুযায়ী খুরদা ও পুরী কোম্পানির সম্পত্তির মধ্যে আনা হয়। এভাবেই উড়িষ্যার গজপতি রাজাদের গৌরবপূর্ণ অধ্যায় শেষ হয়।

শ্রীজগন্নাথ মন্দিরের কাজকর্ম দেখাশোনার জন্য ব্রাহ্মণ পণ্ডিত অর্থাৎ পরিছাদের একটি কমিটি গঠন করার কথা ভাবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। কিন্তু পরিছারাও মন্দিরের কাজকর্ম যথাযথভাবে করতে পারছিলেন না। অগত্যা রাজা মুকুন্দদেবকে বন্দিদশা থেকে মুক্তি দিল কোম্পানি (ব্রিটিশ সেনারা বন্দি করেছিল মুকুন্দদেবকে। তাঁকে প্রথমে কটকে এবং পরে মেদিনীপুরের জেলে বন্দি করে রাখে বৃটিশরা)। তাঁকে পুরীতে থেকেই শ্রীজগন্নাথ মন্দিরের দেখভাল করতে বলা হল। পুরীর মন্দিরের সুপারিন্টেন্ডেন্ট করা হল রাজাকে। তবে মন্দির-পরিছাদের নিয়োগ ও বরখাস্ত করার অধিকার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নিজের হাতেই রেখেছিল। সেই সময় শ্রীজগন্নাথ মন্দিরের বাৎসরিক খরচ বাবদ ৫৫ হাজার টাকা মঞ্জুর করে কোম্পানি।

মুকুন্দদেবের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে রামচন্দ্রদেব ৩য় (১৮১৭-১৮৫৪) পুরীর মন্দিরের সুপারিন্টেন্ডেন্ট নিযুক্ত হন। তাঁকে বাৎসরিক ২৫,৬০০ টাকার একটা অনুদানও দিত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। এই অনুদান পরবর্তীকালে ‘পলিটিক্যাল পেনশনে’ রূপান্তরিত হয়। পুরীর পরবর্তী সমস্ত রাজাই ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে এই পেনশন পেতেন। প্রসঙ্গত, রামচন্দ্রদেব ৩য়-র সময়েই রাজানহর বা পুরীর রাজবাড়ি বালিসাহি থেকে পুরীর মন্দিরের সামনে বড় দাণ্ডতে স্থানান্তরিত হয়।

এদিকে শ্রীজগন্নাথ মন্দিরের বাৎসরিক খরচ হিসেবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যে টাকাটা এই মন্দিরকে দিত, তার পরিমাণ ক্রমশই কমতে থাকে। এর অন্যতম কারণ, ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দের ২০ এপ্রিল থেকে পুরীতে তীর্থকর নেওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর ফলে কোম্পানি’র অর্থের জোগানে টান পড়ে। প্রথমে ৫৫ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে মন্দিরের বাৎসরিক খরচ ধার্য হল ৩৫,৭৩৮ টাকা। ১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দে তা আরও কমে হয় ২৩,৩২১ টাকা। আর ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে সিপাহী বিদ্রোহের মাত্র এক বছর আগে এই মন্দিরের বাৎসরিক খরচ বাবদ মাত্র ৭ হাজার টাকা মঞ্জুর করা হয়েছিল।

১৮০৬ খ্রিস্টাব্দের জুনে জগন্নাথদেবের রথযাত্রা উৎসবের সময়ে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামের যাজক ক্লডিয়াস বুকানন পুরীতে এসেছিলেন। জগন্নাথদেবের সমালোচনা অত্যন্ত কদর্য ভাষায় করেন তিনি। হিন্দুদের ধর্মীয় বিশ্বাসে চূড়ান্ত আঘাত দিতে এতটুকুও গলা কাঁপেনি তাঁর। ‘Moloch or a blood seeking god’ অর্থাৎ জগন্নাথদেবকে রক্তচোষা এক দেবতা হিসেবেই মন্তব্য করেন বুকানন।

শ্রীজগন্নাথ মন্দিরকে কেন্দ্র করে একবারই আইনি জটিলতা দেখা দেয়। সেই জট খুলতে ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা হাইকোর্টে একটি মামলাও ওঠে। কোম্পানির বদলে ইংল্যান্ডের রানি ভিক্টোরিয়া তখন ভারতের শাসক। ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে মামলা করেন খুরদার রাজা বীরকিশোরদেবের বিধবা পত্নী রানি সূর্যমণি পট্টমহাদেবী। কেন?

১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর অকালে মারা যান বীরকিশোরদেব। তাঁদের দত্তকপুত্র দিব্যসিংহদেব শ্রীজগন্নাথ মন্দির পরিচালনার ব্যাপারে চূড়ান্ত গাফিলতির পরিচয় দেন। ১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দে জগন্নাথদেবের দোলযাত্রা ও গোবিন্দ দ্বাদশীতে অত্যাধিক ভিড়ের চাপে পুরীতে বেশ কয়েকজন তীর্থযাত্রী মারা যান। ঠিক পরের বছরেই ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে একজন সাধুকে খুনের পরিকল্পনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকার অপরাধে দিব্যসিংহদেব অভিযুক্ত হন। তিনি ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে ‘মহারাজা’ উপাধি পেলেও ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই মহারাজাই আদালতের রায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। জীবনের বাকি সময় তাঁর আন্দামানের সেলুলার জেলেই কাটে।

রানি সূর্যমণির নাতি রাজকুমার মুকুন্দদেব ‘রাজা’ উপাধি গ্রহণ করে শ্রীজগন্নাথ মন্দিরের প্রধান সেবক হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলে ব্রিটিশ সরকার বাদ সাধল। সরকার ঘোষণা করল নতুন ট্রাস্টিবোর্ড গঠিত হবে। কীভাবে মন্দির পরিচালনা করা হবে সে ব্যাপারেও নতুন ভাবনাচিন্তার দরকার। ব্রিটিশ সরকারের এই ঘোষণার বিরুদ্ধেই কলকাতা হাইকোর্টে মামলা করেন রানি। সেই সময়ে কলকাতা হাইকোর্টের প্রখ্যাত আইনজীবী মধুসূদন দাস। তিনি খ্রিস্টান ছিলেন। তবুও একজন অসহায় হিন্দু রানির সাহায্যে এগিয়ে আসেন। রানির হয়ে তিনি হাইকোর্টে জোর সওয়াল করেন।

আরও পড়ুন: কালীঘাটের কালীকথা

এরপর ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে রানি ও ব্রিটিশ সরকারের মধ্যে একটা সমঝোতা হয়। এর ফলে নাবালক রাজার প্রতিনিধি হিসেবে শ্রীজগন্নাথ মন্দিরের যাবতীয় কাজকর্ম দেখাশোনা করার অধিকারী হলেন রানি। সূর্যমণির অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ছিল। বুদ্ধিমতীও ছিলেন। রানির এই অনমনীয় মনোভাবে উড়িষ্যার মানুষ গর্বিতই হয়েছিলেন। ব্রিটিশদের কাছে বশ্যতা স্বীকার না করে তিনি যেভাবে রুখে দাঁড়ান তাতে উড়িষ্যাবাসীর গর্বিত হওয়াই স্বাভাবিক।

একটা প্রশ্ন খুব স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে, সেই সময়ে শ্রীজগন্নাথ মন্দিরের প্রতি খ্রিস্টান মিশনারিদের এতটা বিরূপ মনোভাবের কারণ কী? শুধু ভারতের মাটিতেই নয়, ইংল্যান্ডেও এই মন্দিরের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার চালানোর চেষ্টা করেছিল ইংরেজরা। তবে ১৮০৯ খ্রিস্টাব্দের আগে এই মন্দির সম্বন্ধে কোনও ধারণা ছিল না ইংল্যান্ডের মানুষদের। ১৮০৯ খ্রিস্টাব্দে এডি সাদে নামে এক ইংরেজ কবি ‘দি কার্স অফ কেহমা’ কবিতায় জগন্নাথদেবের রথযাত্রার বর্ণনা প্রসঙ্গে এই রথের নীচে (CAR OF JUGGERNAUT) ঝাঁপ দিয়ে তীর্থযাত্রীদের মৃত্যুবরণের কথা ব্যাঙ্গাত্মকভাবে উল্লেখ করেন- ‘Prone fall the frantic votaries on the road/And calling on the god/Their self-devoted bodies there they lay/To pave his chariot’s way/Oh Jaganaut they call/The ponderous car rolls on and crushes all.’

১৮০৬ খ্রিস্টাব্দের জুনে জগন্নাথদেবের রথযাত্রা উৎসবের সময়ে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামের যাজক ক্লডিয়াস বুকানন পুরীতে এসেছিলেন। জগন্নাথদেবের সমালোচনা অত্যন্ত কদর্য ভাষায় করেন তিনি। হিন্দুদের ধর্মীয় বিশ্বাসে চূড়ান্ত আঘাত দিতে এতটুকুও গলা কাঁপেনি তাঁর। ‘Moloch or a blood seeking god’ অর্থাৎ জগন্নাথদেবকে রক্তচোষা এক দেবতা হেসেবেই মন্তব্য করেন বুকানন। ভারতের গভর্নর-জেনারেলের কাউন্সিলের সদস্য উডনেকে লেখা এক চিঠিতে ক্লডিয়াস বুকানন জগন্নাথদেবের রথের নীচে তীর্থযাত্রীদের মৃত্যুর ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। রথযাত্রা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাছাড়া পুরীতে নতুন করে তীর্থকর বসানোর মধ্যে দিয়ে ইংরেজ শাসকরা মূর্তিপুজোকেই সরাসরি মদত দিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন বুকানন।

এমনকী সেই সময় ভারতের গভর্নর-জেনারেল লর্ড মিন্টোকেও কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন বুকানন- ‘ভারতের মূর্তিপুজোর অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক লর্ড মিন্টোই’। বুকাননের পরামর্শে শ্রীরামপুরের মিশনারিরা ‘রাইজ অব উইজডম’ নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন। তাতে শ্রীজগন্নাথ মন্দিরের প্রতি ব্রিটিশ সরকারের অযথা সহানুভূতির তীব্র সমালোচনা করা হয়। এই পুস্তিকায় এ কথাও লেখা হয়- ‘প্রতি বছর পুরীতে রথযাত্রা উপলক্ষে ১ লক্ষ ২০ হাজার তীর্থযাত্রীর সমাগম হয়। জগন্নাথদেবের রথের নীচে কত দুর্ভাগার মৃত্যু হয় কে জানে!’ তাঁরা আরও প্রচার করেন যে, এই ধরনের মৃত্যুর ব্যাপারে শ্রীজগন্নাথ মন্দিরের পূজারি ও অন্য দর্শনার্থীদেরও প্রচ্ছন্ন উৎসাহ থাকে।

আরও পড়ুন: ঢাকেশ্বরী মন্দির বাংলাদেশের বহু বিবর্তনের নীরব সাক্ষী

পুরীর মন্দির, জগন্নাথদেব, রথযাত্রা ইত্যাদি নিয়ে ইউরোপিয়ানদের মনে ইংরেজ মিশনারিরা একটা ভয়াভহ চিত্র তুলে ধরতে পেরেছিলেন ঠিকই, তবে এই অপপ্রচারের বিরুদ্ধে ভারতে বসবাসকারী ইংরেজদেরই একাংশ তীব্র প্রতিবাদ জানান। ১৮০৯ খ্রিস্টাব্দে কটকের সেটলমেন্ট কমিশনার ছিলেন চার্লস বুলার। সেই বছরেই তিনি পুরীতে এসেছিলেন রথযাত্রা দেখতে। ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য হিসেবে ‘হাউস অব কমনস’-এ তিনি একটি চিঠি লেখেন- ‘পুরীর জগন্নাথদেবের নামে যে নিষ্ঠুর মৃত্যুর ঘটনার কথা ফলাও করে প্রচার করেছেন ইংরেজ মিশনারিরা, তার মধ্যে সত্যতা বলে কিছু নেই। আমার ধারণা হিন্দুধর্মে এভাবেই মৃত্যুবরণ করার কোনওরকম পরামর্শও দেওয়া হয়নি। ১৮০৯ খ্রিস্টাব্দে পুরীতে যে রথযাত্রা হয়েছিল সেখানে আমি উপস্থিত ছিলাম। সেবার জগন্নাথদেবের রথের নীচে মৃত্যুবরণের কোনও ঘটনাই আমার চোখে পড়েনি। হতে পারে কখনও কখনও রথযাত্রার সময় জগন্নাথদেবের রথের নীচে ঝাঁপিয়ে পড়ে কেউ কেউ মৃত্যুবরণ করেছে। কিন্তু হয় তারা পাগল বা কট্টর হিন্দু’।

উইলিয়াম ব্যাম্পটন নামে এক ইংরেজ মিশনারি তো ১৮০৩ খ্রিস্টাব্দে পুরীতে এসে এমন ভবিষ্যদ্বাণীও করে বসেন- ‘অদ্ভুত চেহারার জগরনাথের (Juggernaut) একদিন অবশ্যই পতন ঘটবে। যে জায়গা তাঁর নামে প্রসিদ্ধ, সেই জায়গাই একদিন তাঁকে চিরদিনের জন্য ভুলে যাবে।’ কিন্তু উইলিয়াম ব্যাম্পটন তাঁর জীবদ্দশাতেই স্বচক্ষে দেখে যান শ্রীজগন্নাথ মন্দির, জগন্নাথদেব ও তাঁর রথযাত্রা উৎসব নিয়ে আমজনতার কী অসীম উৎসাহ!

তিনি খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে আবার পুরীতে এসেছিলেন ১৮২২ খ্রিস্টাব্দের ১২ ফেব্রুয়ারি। যত দিন যায় রথযাত্রা উৎসবে তীর্থযাত্রীর সংখ্যা তত বেড়েই চলে। উইলিয়াম ব্যাম্পটন অবাক হয়ে দেখেন শুধু ওড়িয়ারা নন, ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত বাঙালিরাও শ্রদ্ধাবনত চিত্তে জগন্নাথদেবের পুজো করছেন। বিজ্ঞান ও ইউরোপীয় সাহিত্যের কৃতী বাঙালিদের অনেককেই কলকাতা থেকে পুরীতে আসতে দেখেছেন তিনি। এঁরা যে জগন্নাথদেবের আকর্ষণেই এখানে আসেন সেকথাও জীবনের একেবারে শেষ লগ্নে স্বীকার করে গিয়েছেন মিশনারি উইলিয়াম ব্যাম্পটন। সত্যের জয় হয় সবসময়।

১৮২৫ খ্রিস্টাব্দে পুরীতে রথযাত্রার সময় বেশ কয়েকজন তীর্থযাত্রী কলেরায় মারা যান। এই ঘটনায় উইলিয়াম ব্যাম্পটনেরই এক সহযোগী জেমস পেগস জগন্নাথদেব ও তাঁর রথযাত্রার কড়া সমালোচনা করেন। তিনি লেখেন- ‘জগন্নাথের মন্দিরের সামনেই একদিন সকালে বেশ কয়েকজন মৃত ও মৃত্যুপথযাত্রী তীর্থযাত্রীকে আমি নিজের চোখে দেখেছি।’ পেগসের এই দাবি সত্যি হলেও তখনকার দিনে শুধু পুরী নয়, কটকেও কোনও সরকারি হাসপাতাল ছিল না। কেউ কলেরায় আক্রান্ত হলে একরকম বিনা চিকিৎসায় মারা যেত। চিকিৎসার অভাবের এই সুযোগটাই কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন খ্রিষ্টান মিশনারিরা শুধু রথযাত্রার মতো একটি পবিত্র ও অত্যন্ত আকর্ষণীয় উৎসবেরই কেন সমালোচনা করতেন আশাকরি পাঠকদের তা বুঝতে অসুবিধে হবে না।