পশ্চিমবঙ্গ কেবল মানচিত্রে বাংলার একটি অংশমাত্র নয়, এটি একটি ভাবনা, বাঙালি হিন্দু-বৌদ্ধর পাঁচ হাজার বছরের ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে আত্মিক যোগকে বজায় রাখার প্রচেষ্টা। ১২০০ সাল থেকে পাঁচশো বছরের ইসলামী শাসনের বিভীষিকা ও ১৯৩৭-৪৭-এর মুসলিম লীগের দাঙ্গাবাজ রাজনীতি শ্যামাপ্রসাদ, যদুনাথ সরকার, সুনীতি চট্টোপাধ্যায়, বিধান রায়-সহ বাঙালি মনীষীরা মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠতা বর্জিত পশ্চিমবঙ্গের ভাবনাকে বাস্তবায়িত করতে সচেষ্ট হন।

বাঙালি মুসলমান সম্পর্কে যাঁদের ন্যূনতম দুর্বলতা আছে এবং হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা নামক একটি দৈত্যকে বিশ্বাস করেন, তাঁদের মুখের উপর পশ্চিমবঙ্গ ও পূর্ব-পাকিস্তান/বাংলাদেশের ধর্মীয় জনসংখ্যার সংখ্যাতত্ত্বকে পাদুকা করে মুখমন্ডলে ছুঁড়ে মারুন।  ১৯৫১-র  ১৯% পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান বেড়েবর্তে ২০১১ তে ২৭% হয়েছে প্রায় দুকোটি হিন্দু উদ্বাস্তুর আগমন সত্ত্বেও। আর বাংলাদেশের বাঙালি মুসলমান ১৯৫১-র ২২% হিন্দুদের মেরেধরে, লুট করে, ধর্ষণ করে ২০১১তে ৮% হিন্দু করে ছেড়েছে। ৮০ শতাংশ হিন্দু নিয়ে তৈরি পশ্চিমবঙ্গের ভাবনাটির ভবিষ্যৎ এখন অনুপ্রবেশ আর বামপন্থী-তৃণমূল-ইসলামী মৌলবাদের আঁতাতে ৩০ শতাংশ মুসলমানের আক্রমণে অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। এখন তাই প্রয়োজন আইনি ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ভারতীয় নাগরিক ও অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশী মুসলমানদের চিহ্নিতকরণ, অনুপ্রবেশকারী বিতাড়ন করে পশ্চিমবঙ্গের ভাবনাটিকে পুনরায় ফিরিয়ে আনা।  নাগরিকত্ব বিল ও এনআরসি না হলে পশ্চিমবঙ্গ পশ্চিম বাংলাদেশ হয়ে যাবে।

এখন বামপন্থীরা ও তৃণমূল কংগ্রেস অবৈধ অনুপ্রবেশকারী ও উদ্বাস্তুদের মধ্যে গুলিয়ে দিতে চাইছেন। কিন্তু এঁদের মধ্যে তফাৎ অনেক। উদ্বাস্তুরা হচ্ছেন বাংলাদেশ বা পাকিস্তান থেকে ধর্মীয় কারণে অত্যাচারিত হয়ে আসা সংখ্যালঘু হিন্দু, বৌদ্ধ খ্রিস্টানরা। রাষ্ট্রসঙ্ঘের উদ্বাস্তুর সংজ্ঞায় খুব পরিষ্কারভাবে বলা রয়েছে- ধর্মীয় আক্রমণে বা আক্রমণের ভয়ে যাঁরা অন্য দেশে আশ্রয় নেবেন তারাই উদ্বাস্তু। বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু মুসলমান সম্প্রদায়ের যে মানুষেরা ভারতে ঢুকেছেন তাঁরা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। এই সরল সত্যটি ভুলিয়ে দিতে তৃণমূল কংগ্রেস, সিপিআইএম,  কংগ্রেস বিভিন্ন অপপ্রচারের আশ্রয় নিয়েছে।

এবারের নির্বাচনে তাই নাগরিকত্ব বিল, এনআরসি এবং অনুপ্রবেশকারী বিতাড়ন নিয়ে বারবার বক্তব্য রাখছেন নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহ। পশ্চিমবঙ্গ অনুপ্রবেশকারী মুক্ত ও ভারতীয় সংস্কৃতির নবজাগরণ না হলে কোন দল নির্বচনে জিতল তাতে পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম বাংলাদেশ হওয়া কোনওরকম ভাবে ঠেকানো যাবে না।

অনুপ্রবেশ সমস্যা নতুন নয়। ১৯৯০ সালে কমিউনিস্ট স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত সংসদে ১ কোটি বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারীর কথা বলেছিলেন। সিপিএমের মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু ১৯৯২ সালে গণশক্তি পত্রিকায় অনুপ্রবেশ সমস্যা নিয়ে প্রবন্ধ লিখেছেন, ২০০৪ সালে কংগ্রেসের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শ্রী প্রকাশ জয়সোয়াল সংসদে ১কোটি ২৫ লক্ষ বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারীর কথা বলেছিলেন এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০০৫ সালে সংসদে  সমস্যা ও তাদের দিয়ে সিপিএম ভোট করাচ্ছে বলে কাগজপত্র ছুঁড়ে হল ছাড়েন। কিন্তু এখন সবাই একজোট হয়ে বাংলাদেশের অনুপ্রবেশকারীদের বাঁচাতে পথে নেমেছেন।

এখন বামপন্থীরা ও তৃণমূল কংগ্রেস অবৈধ অনুপ্রবেশকারী ও উদ্বাস্তুদের মধ্যে গুলিয়ে দিতে চাইছেন। কিন্তু এঁদের মধ্যে তফাৎ অনেক। উদ্বাস্তুরা হচ্ছেন বাংলাদেশ বা পাকিস্তান থেকে ধর্মীয় কারণে অত্যাচারিত হয়ে আসা সংখ্যালঘু হিন্দু, বৌদ্ধ খ্রিস্টানরা। রাষ্ট্রসঙ্ঘের উদ্বাস্তুর সংজ্ঞায় খুব পরিষ্কারভাবে বলা রয়েছে- ধর্মীয় আক্রমণে বা আক্রমণের ভয়ে যাঁরা অন্য দেশে আশ্রয় নেবেন তারাই উদ্বাস্তু। বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু মুসলমান সম্প্রদায়ের যে মানুষেরা ভারতে ঢুকেছেন তাঁরা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। এই সরল সত্যটি ভুলিয়ে দিতে তৃণমূল কংগ্রেস, সিপিআইএম,  কংগ্রেস বিভিন্ন অপপ্রচারের আশ্রয় নিয়েছে। কখনও তারা বাঙালি বাঁচাও ডাক দিয়ে বাংলাদেশের অনুপ্রবেশকারীদের বাঁচাতে চাইছে,  কখনও  বাংলাদেশী মুসলমানদের তাড়ানো সাম্প্রদায়িকতা বলে হৈচৈ করছে।

তৃণমূল ও সিপিআইএম উদ্বাস্তু অঞ্চলে প্রচার চালাচ্ছে যে হিন্দু উদ্বাস্তুদেরও বিজেপি বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেবে। এটিও চূড়ান্ত মিথ্যা। কারণ, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান উদ্বাস্তুদের ভারতে থাকা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বের বিজেপি সরকার গত ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৫তে পাসপোর্ট আইন ও বিদেশী আইন সংশোধন করেছে। এই সংশোধনে বলা হয়েছে যে বাংলাদেশ থেকে চলে আসা সমস্ত হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান উদ্বাস্তুদের ভারতে বসবাস করবার আইনী স্বীকৃতি দেওয়া হল। সুতরাং কোনও হিন্দু উদ্বাস্তুদের তাড়ানোর কথা একেবারেই মিথ্যা।

অসমে এই অনুপ্রবেশের সমস্যা নিয়ে ১৯৭৯ সালেই অসমীয়া সমাজ গর্জে ওঠে, ব্যাপক আন্দোলন শুরু করে ছাত্র সমাজ। দীর্ঘ ছয় বছর আন্দোলনের পর ১৯৮৫ সালে তৎকালীন কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর সরকারের সঙ্গে এক চুক্তি অনুযায়ী অসমে নাগরিকপঞ্জী নবীকরণ বা এনআরসি তৈরি করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। দীর্ঘকাল বিভিন্ন আইনি বাধায় তা করা হয়নি, এখন সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী নাগরিকপঞ্জী নবীকরণের কাজ শেষ হয়েছে। এই কাজটির উদ্দেশ্য অসমে বিদেশী নাগরিকদের তালিকা তৈরি করা। এটি বাঙালি বিরোধী কোনও আন্দোলন নয়। এর জন্য কোনও বাঙালি উদ্বাস্তু ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না।

NRC

একইভাবে পশ্চিমবঙ্গকে বিদেশীমুক্ত করতে আমরা পশ্চিমবঙ্গেও এনআরসি চালু করতে চাই। এর জন্য পশ্চিমবঙ্গবাসী কোনও ভারতীয় হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলমান-খ্রিস্টান-জৈন কোনওরকম অসুবিধায় পড়বেন না। বিদেশীদের আইনসঙ্গতভাবে চিহ্নিত করেই আমরা পশ্চিমবঙ্গকে বিদেশীমুক্ত করতে পারব। এজন্য বিজেপি’র কেন্দ্রীয় সরকার নাগরিকত্ব আইনের একটি সংশোধন গত ১৯সে জুলাই ২০১৬তে  সংসদে পেশ করেছে। এই বিলে বলা হয়েছে যে বাংলদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে আগত সব সংখ্যালঘু হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলমান, খ্রিস্টান, জৈন, শিখ সম্প্রদায়ের মানুষেরা ভারতের নাগরিকত্ব পাবেন। সিপিআইএম, তৃণমূল ও কংগ্রসের বিরোধিতায় বিলটি এখনও পাশ না হলেও আগামী দিনে তা হয়ে যাবে। আগামী দিনেই বিজেপি নাগরিকত্ব বিল পাশ করে উদ্বাস্তুদের নাগরিকের মর্যাদা প্রদান করবে।

আরও পড়ুন: নাগরিকত্ব বিল লোকসভায় পাশ হল, আমার কুড়ি বছরের পথচলাও শেষ হল

এই অনুপ্রবেশকারীরা আমার আপনার রুটি রুজি, জমিতে ভাগ বসাচ্ছে, ভারত সরকারের জনকল্যাণ প্রকল্পের টাকা নিয়ে নিচ্ছে বিদেশীরা। এই ৩০% জনশক্তির দাপটে মুসলিম নারীদের মানবাধিকার রক্ষায় তিন তালাক রদের বিলটির বিরোধিতা করেছে তৃণমূল, এমনকি এই সরকারের মন্ত্রী তিন তালাকের সমর্থনের সভায় ভাষণ পর্যন্ত দিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে মাদ্রাসা শিক্ষায় ২০০৯-১০ এ বাজেট ছিল ৬১০ কোটি টাকা, তৃণমূল সরকারের আমলে এখন তা বেড়ে হয়েছে ২৮১৫ কোটি টাকা অথচ বৃহৎ শিল্পের জন্য বাজেট বরাদ্দ এর কম ২১৫৪ কোটি টাকা।  আমরা দেখেছি হাওড়ায় একটি স্কুলে সরস্বতী পূজা করতে দেওয়া হয়নি বরং সেজন্য আন্দোলনকারী ছাত্রীকে পুলিশ মেরে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে। তৃণমূল সরকার বারবার হিন্দু ধর্মীয় অধিকারে হস্তক্ষেপ করেছে, দুর্গা পূজার বিসর্জনের দিন পাল্টিয়েছে। কলকাতার কাছেই ভাঙড়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দুটি গোষ্ঠী শিল্প স্থাপন নিয়ে দ্বন্দ্বে পুলিশের উপর আক্রমণ করে পুলিশের অনেকগুলি গাড়ি নষ্ট করলেও পুলিশ লাঠি পর্যন্ত চালায়নি কিন্তু তৃণমূল সরকারের সেই পুলিশ উত্তর দিনাজপুরের দাড়িভিট গ্রামের স্কুল ছাত্রদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে গুলি চালিয়ে দুটি হিন্দু ছাত্রকে হত্যা করেছে। ধুলাগড়, খাগড়াগড়-সহ বিভিন্ন ধ্বংসাত্মক ঘটনায় মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে এই সরকার কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। বাংলা ভাগ করে পশ্চিমবঙ্গ তৈরি হয়েছিল হিন্দুদের সংস্কৃতি-জীবন-সম্মান রক্ষার জন্য। কিন্তু অনুপ্রবেশের ফলে ধর্মীয় জনসংখ্যার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে পশ্চিমবঙ্গ পশ্চিম বাংলদেশে পরিণত হতে চলেছে।