নতুন বছরে নতুন বলতে আতঙ্ক। নতুন করে। নতুন শাড়ি, নতুন ম্যাক্সি আর নতুন মাস্ক। মাস্ক নিয়ে টানাপোড়েন ছেড়ে মাস্ক-শোভিত হওয়াই আমাদের ভবিতব্য। করোনা ভাইরাসের নতুন রূপে নতুন দিগন্তে উন্মেষিত। শয়ে শয়ে মানুষ নির্বাচনী প্রচারের মিছিলে আর চৈত্র সেলে। থালা, বাটি, তুবড়ি পটকায় আর কাজ হবে না এবার। এবার মারো নয় মরো। ওই ভোটের হিংসার মতোই ব্যাপারটা। কোভিড ভাইরাস ঠিক করে নিয়েছে ছক। এলোমেলো করে দে মা, লুটেপুটে খাই। হসপিটালে বেড, অক্সিজেন, টিকা সব অপ্রতুল। 

এসব নিয়ে উদযাপন হয়? তবুও করবেন অনেকেই ভুলে থাকতে। স্যানিটাইজার মাখা খসখসে হাত আর মাস্ক পরা ভোঁতা নাক নিয়ে গলগল করে ঘামতে ঘামতে আয়োজন করবেন একলা না থাকার বৈশাখ। হালখাতা হবে ব্যবসার হাল ফেরাতে। পরিস্থিতি কোনওদিকেই বিশেষ সুবিধের নয়। ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে ফুল ছুঁড়ে ছুঁড়ে নির্বাচনী মিছিলে একে অপরকে বরণ করার পঞ্চবার্ষিকী বাসরে হাউসফুল ভিড়ে এপ্রিল ফুল হচ্ছেন জনগণ। কিন্তু কে কার কথা শোনে! একদিকে ফুল অন্যদিকে হাড় হিম করা হুমকি! রাজনীতির রণাঙ্গন যেন মশলাদার সিনেমার বহুচর্চিত প্লট। পরতে পরতে নাটক। নড়বড়ে ভীতু প্রাণ আর কত সইবে? স্পেশাল অ্যাপিয়ারেন্সে বছর শেষে খেলা ঘুরিয়ে দিয়েছে কোভিড ১৯। দৃশ্যমান ও অদৃশ্য ভাইরাসে ভাইরাসে জর্জরিত বাঙালি মুক্তি চায়।

জটিল অঙ্ক কষে সম্রাট আকবরের নির্দেশে জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেহ উল্লাহ সিরাজি সৌর ক্যালেন্ডার ও হিজরি ক্যালেন্ডারের নিরিখে নতুন বাংলা ক্যালেন্ডার তৈরি করেন কৃষকদের সমস্যা মেটাতে। ফসল উৎপাদন কাল আর খাজনা আদায়ের দিনক্ষণ হিজরি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী মিলত না। এরপর থেকে চৈত্র মাসের শেষ দিন কোষাগারে খাজনা ও শুল্ক জমা করত কৃষকরা আর জমিদার জোতদাররা পয়লা বৈশাখ প্রজাদের মিষ্টি বিতরণ করত। এই উপলক্ষ্যে আনন্দ উৎসবে মেতে উঠত সবাই। আকবরের তৈরি করা দিনপঞ্জিকা যেভাবে আমাদের বৈশাখী উৎসবের মূলে রয়েছে সেভাবেই বাঙালি আরও অন্যান্য উৎসবের শরিক হয়ে এসেছে চিরটাকাল। ধর্ম, জাত, আচার-বিচার নিয়ে তার তেমন মাথা ব্যথা নেই। চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয় নিয়েই তার চিন্তা, পরিকল্পনা ও মাতামাতি।

কবিতা, গান, নববর্ষের বৈঠক এইসব নিয়ে সে মশগুল থাকতে চায়। বাঙালি সারা বছর ধরে পরিকল্পনা করে, ২৫শে বৈশাখ পালন হোক ধুমধাম করে। কিন্তু সে গুড়ে বালি ঢেলে দিচ্ছে এই খতরনাক করোনা। যাব যাব করেও যে যায় না। নব্য বাঙালি হাল ছাড়ে না যদিও সহজে, তাই অনলাইনেই সই। নতুন ক্যালেন্ডার যেন পালটে দিতে পারে তাদের জীবন, এতটুকুই তো আশা! সুসময় আশার অপেক্ষায় দিন গোনে। পুজো, অনুষ্ঠান ছাড়া বাংলা তারিখ, তিথি, ক্ষণের তেমন দরকার পড়ে না বাঙালির। আর বাঙালি তো জানেই যে এই ক্যালেন্ডারের স্রষ্টা কোন‍ও বাঙালি নয়। এসব নিয়ে কোনওদিন মাথা ঘামায়নি তারা। জটিল অঙ্ক কষে সম্রাট আকবরের নির্দেশে জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেহ উল্লাহ সিরাজি সৌর ক্যালেন্ডার ও হিজরি ক্যালেন্ডারের নিরিখে  নতুন বাংলা ক্যালেন্ডার তৈরি করেন কৃষকদের সমস্যা মেটাতে। ফসল উৎপাদন কাল আর খাজনা আদায়ের দিনক্ষণ হিজরি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী মিলত না। এরপর থেকে চৈত্র মাসের শেষ দিন কোষাগারে খাজনা ও শুল্ক জমা করত কৃষকরা আর জমিদার জোতদাররা পয়লা বৈশাখ প্রজাদের মিষ্টি বিতরণ করত। এই উপলক্ষ্যে আনন্দ উৎসবে মেতে উঠত সবাই। আকবরের তৈরি করা দিনপঞ্জিকা যেভাবে আমাদের  বৈশাখী উৎসবের মূলে রয়েছে সেভাবেই বাঙালি আরও অন্যান্য উৎসবের শরিক হয়ে এসেছে চিরটাকাল। ধর্ম, জাত, আচার-বিচার নিয়ে তার তেমন মাথা ব্যথা নেই। চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয় নিয়েই তার চিন্তা, পরিকল্পনা ও মাতামাতি। পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ ছাড়াও অসম, পাঞ্জাব, তামিলনাড়ু, কেরল প্রভৃতি রাজ্যেও বৈশাখের দিন ঘিরে নানা উৎসবের আয়োজন। বাংলাদেশে এই উৎসবের আকার ও ব্যাপ্তি অনেকখানি।  নানা মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মঙ্গল শোভাযাত্রা, সব মিলিয়ে রমরম করে শহর, শহরতলি। নতুন পোশাক, ইলিশ মাছ, মিষ্টি এইসব কিনে, খেয়ে এবং খাইয়ে উৎসব পালন করেন ওপার বাংলার মানুষ।

বছরের প্রথম দিন যেন ভালো যায় তাহলে গোটাবছর ভালো যাবে এসব তত্ত্ব মেনে চলি আমরা। ভালো খাই, নতুন পোশাক পরি, বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করি, আর চাই অবসান হোক সব খারাপের। বাজে কথা, ইতর ভাষা, হিংসা, রক্ত, মৃত্যু সঙ্গে নিয়ে নতুন বছর শুরু করতে মন চায় না। আমি ভালো থাকব অথচ ভালো নেই অন্য কেউ, এভাবে ভালো থাকা যায়? নতুন বছরে আমরা অন্তত একটা শপথ নিই, ভালো থাকার শপথ। রোগ, ব্যাধি মুক্ত হোক ১৪২৮।

সর্ব খর্বতারে দহে তব ক্রোধদাহ–

হে ভৈরব, শক্তি দাও, ভক্ত-পানে চাহো ॥

দূর করো মহারুদ্র   যাহা মুগ্ধ, যাহা ক্ষুদ্র-

মৃত্যুরে করিবে তুচ্ছ প্রাণের উৎসাহ ।।

দুঃখের মন্থনবেগে উঠিবে অমৃত,

শঙ্কা হতে রক্ষা পাবে যারা মৃত্যুভীত।

তব দীপ্ত রৌদ্র তেজে   নির্ঝরিয়া গলিবে যে

প্রস্তরশৃঙ্খলোন্মুক্ত ত্যাগের প্রবাহ ॥