ইদানীং ভারতবর্ষে ‘নিখরচায় প্রাকৃতিক চাষ’ প্রসঙ্গ গুরুত্ব দিয়েই আলোচিত হচ্ছে। সম্প্রতি নীতি আয়োগের সহ-সভাপতি রাজীব কুমার উল্লেখ করেছেন আমাদের দেশে কৃষকের আয় দ্বিগুণ করার লক্ষ্যে নিখরচায় এই চাষ পদ্ধতি প্রয়োগ করা হবে।

নিখরচায় প্রাকৃতিক চাষ আসলে কী?

এ এমন এক চাষ পদ্ধতি যেখানে কৃষককে চাষের জন্য বাজার থেকে কিছু কিনতে হবে না। ফলে তার ওপরে ঋণের বোঝা চাপবে না। চাষ হবে একেবারে প্রাকৃতিক উপায়ে, কোনও রাসায়নিক ব্যবহার না করেই। চমকপ্রদ পদ্ধতিই বটে। বিশেষত ভারতবর্ষের মতো দেশে নয়া উদারবাদী অর্থনীতির পথ গ্রহণের পরে যেভাবে গভীর কৃষি সংকটে নিমজ্জিত হয়েছে, অবস্থা এমন জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে যে ছোট কৃষকেরা আর কৃষিকাজে যুক্তই থাকতে চাইছেন না, সেখানে নিখরচায় চাষের ধারণা অবশ্যই আকর্ষনীয়।

সবুজ বিপ্লব পরবর্তী পর্যায়ে আমাদের মতো দেশে যে সমস্যাগুলি অত্যন্ত প্রকট হয়েছে তা হল- কৃষি উৎপাদনে ভারসাম্যের অভাব, অত্যাধিক রাসায়নিক নির্ভরতা, বিশেষত সার এবং কীটনাশক নির্ভরতা, জলসম্পদের অপরিকল্পিত ব্যবহার ও বন্টন, উৎপাদনশীলতা হ্রাস, পরিবেশদূষণ বিশেষত খাদ্যে বিপজ্জনক মাত্রায় বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক মিশে যাওয়া ও কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া এবং তাঁদের কৃষি খননে জর্জরিত হওয়া। ড: এস স্বামীনাথনের নেতৃত্বে গঠিত কৃষক কমিশনের সুপারিশও আমাদের দেশে কার্যকরীভাবে প্রয়োগ করা হয়নি। এমতাবস্থায় শ্রী সুভাষ পালেকার ‘নিখরচায়’ প্রাকৃতিক চাষের ধারণা নিয়ে এসেছেন। একজন কৃষিস্নাতক হিসেবে কৃষি প্রযুক্তির সমস্যাগুলি বিশ্লেষণ করেই এই ধারণাকে সামনে এনেছেন তিনি। দাক্ষিণাত্যের রাজ্যগুলিতে এই প্রাকৃতিক চাষ পদ্ধতির প্রয়োগ শুরু হয়েছে। শ্রী পালেকার ইতিমধ্যে এই কাজের সুবাদে পদ্মশ্রী সম্মানও পেয়েছেন।

এই নিখরচায় প্রাকৃতিক চাষের ধারণাটির নতূনত্ব কী?

ভারতবর্ষে জৈব চাষ পদ্ধতিতে দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। এই চাষ পদ্ধতিই অতীতে এদেশের অর্থনীতির বুনিয়াদ তৈরী করেছিল। সে চাষে উদ্ভিজ এবং প্রাণীজ পদার্থই সার হিসেবে বা কীটনাশক হিসেবে ব্যবহৃত হত। ফলত: এদেশে গো সম্পদই মূল কৃষি সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হত। শুধু দুধের জন্য নয়, বলদ ব্যবহৃত হত লাঙল টানার কাজে, গোবর থেকে হত সার। ভারতবর্ষের প্রথাগত এই চাষ পদ্ধতি গবেষণার দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করে নথিভুক্ত করেন অ্যালবার্ট হাওয়ার্ড এবং তাঁর স্ত্রী গ্যাব্রিয়েল, এই ব্রিটিশ উদ্ভিদ বিজ্ঞানী দম্পতি ১৯০৫-২৪ সালে ইন্দোরে সরকারি কৃষি খামারে এই পরীক্ষা নিরীক্ষার কাজ করেন ও ১৯৪০ সালে ‘An Agricultural Testament’  নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন।

ভারতবর্ষে জৈব চাষ পদ্ধতিতে দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। এই চাষ পদ্ধতিই অতীতে এদেশের অর্থনীতির বুনিয়াদ তৈরী করেছিল। সে চাষে উদ্ভিজ এবং প্রাণীজ পদার্থই সার হিসেবে বা কীটনাশক হিসেবে ব্যবহৃত হত। ফলত: এদেশে গো সম্পদই মূল কৃষি সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হত। শুধু দুধের জন্য নয়, বলদ ব্যবহৃত হত লাঙল টানার কাজে, গোবর থেকে হত সার। 

পরে ৬০-এর দশক নাগাদ আসে সবুজ বিপ্লবের ধারণা। এই সবুজ বিপ্লব ছিল মূলত: রসায়ন নির্ভর। ভারতবর্ষের প্রথাগত চাষ পদ্ধতিকে উচ্ছেদ করে রাসায়নিক সার, কীটনাশকের ব্যবহার সর্বব্যপ্ত হয় এদেশে। এই পদ্ধতির সুফল, কুফল ইতিমধ্যেই বহু আলোচিত। উদাহরণ হিসেবে কৃষিতে নানা ধরনের রাসায়নিক নাশকের ব্যবহার বৃদ্ধির কথা আমরা আলোচনা করতে পারি। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে প্রতি একর খাদ্য উৎপাদনে রাসায়নিকের ব্যবহার ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারতবর্ষে কৃষিতে প্রায় দেড় দশক কালের রাসায়নিক ব্যবহারের চালচিত্র নিম্নরূপ-

 

তথ্যসারণী বিশ্লেষণ করলে, আমাদের দেশে রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারে হঠাৎ হঠাৎ হ্রাস কিন্তু দেশের অর্থনীতির অস্থির সূচক হিসেবেই চিহ্নিত হয়।

রাসায়নিক নির্ভর এই কৃষি ব্যয়বহুলও বটে। এই পদ্ধতিতে চাষবাসের জন্য কৃষককে যে ঋণ নিতে হয় তা মুখ্যত অত্যন্ত উচ্চহারে সুদখোর মহাজনদের কাছ থেকেই আসে। উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার ফলে কৃষকের আত্মহত্যা ভারতীয় কৃষক সমাজের মধ্যে এক বিপজ্জনক প্রবণতা হিসেবে হাজির হয়েছে। আমাদের দেশের নীতিআয়োগ সম্ভবত সেই কারণেই এই নিখরচার প্রাকৃতিক চাষ পদ্ধতিকে উৎসাহিত করতে চাইছে।

সবুজ বিপ্লব প্রযুক্তির পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাবের কথা বিবেচনা করেই সুসংহত শস্যউৎপাদন, কীট ও রোগ নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি পদ্ধতিগুলি প্রকল্প আকারে আমাদের দেশে আসতে শুরু করে ৭০ দশকের শেষের দিক থেকে।

agriculture in India

প্রাকৃতিক চাষ বা যান্ত্রিক কোনও পদ্ধতি ব্যবহার না করে চাষ (Do Nothing Agriculture) :

জাপানের কৃষক মাসানোবু ফুকুয়োকা ১৯৯৮ সালে ‘One-Straw Revolution’ নামে একটি বই লিখলেন। সেই বইয়ের মাধ্যমে তিনি কৃষিতে লাঙল বা যন্ত্র ব্যবহার, আলাদাভাবে আগাছা নিয়ন্ত্রণ এমনকি জমিতে যেকোনও ধরনের সার আলাদাভাবে প্রয়োগ করাও অপ্রয়োজনীয় বলে উল্লেখ করেন। ফুকুয়োকা’র এই তত্ত্ব নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু সাড়া পড়লেও তা শেষপর্যন্ত কৃষিজীবী মানুষের কাছে গ্রহণ যোগ্য হয়ে ওঠেনি।

এরপর আসে বায়োডাইনামিক কৃষি ধারণা। যা মূলত: জৈব কৃষির মতোই একটি ব্যবস্থা। কিন্তু যে পদক্ষেপগুলি ব্যবহারের প্রস্তাব বায়োডাইনামিক কৃষিতে হাজির করা হয় তা বিজ্ঞান গ্রাহ্য হয়নি।

পরবর্তীতে আসে ভার্মিকালচারের ধারণা। মাটির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করার জন্য কেঁচো ব্যবহার করা হয় এই পদ্ধতিতে। কিছু সমস্যা থাকলেও কৃষিতে ‘কেঁচো সার’ ব্যবহার বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে।

ন্যাচুইকো কালচার এই ধরনেরই আরও একটি শব্দবন্ধ। ন্যাচারাল এবং ইকোল-জিকাল এই দুই শব্দকে যুক্ত করে তা তৈরি করা হয়। মূল ভাবনা প্রাকৃতিক ব্যবস্থার সঙ্গে সাযুজ্য রেখেই কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি। সংশ্লিষ্ট খামারের চারপাশের সম্পদের ওপর নির্ভর করেই এগোনোর কথা বলা হয় এই পদ্ধতিতে। এই পদ্ধতিতেও external inputs-এর ওপর নির্ভরতা কমানোর কথা বলা হয়। দাভোলকার, ২০০১ সালে যখন এই পদ্ধতির ব্যাখ্যা দিয়ে তথাকথিত ‘জৈব কৃষি’র সীমানাকেও অতিক্রম করে এগোনোর আহ্বান জানান। এই পদ্ধতিতে অম্রুত মাটি এবং অম্রুত জল ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়। জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ মাটির ছোট ছোট ঢিবি তৈরি করে তার মালচিং করা হয়। ফলত এই মাটি সব সময় একটু ভেজা থাকে, যাকে তিনি বলেন অম্রুত মাটি। এই জৈব পদার্থ তৈরি করার জন্য জমির ঘাস, পাতা, শুকনো গাছপালা কুচিয়ে গুঁড়ো করে অম্রুত জলে মেশাতে হয়। এই অম্রুত জল তৈরি করা হয় গোমূত্র, ঘোলা গুড়ের সাথে জল মিশিয়ে কয়েক দিন রেখে fermentation করে নিয়ে।

এই পদ্ধতি Kitchen Garden-এ সফলভাবে ব্যবহার করা গেলেও বড় কৃষি জমিতে সম্ভব হয় না।

‘নিখরচায় প্রাকৃতিক চাষ’ পদ্ধতিতে ‘বীজামৃত’ বা বীজশোধন, ‘জীবামৃত’ বা জীবাণু কালচার তৈরি, ‘আচ্ছাদন’ বা মালচিং এবং সয়েল এয়ারেশন।

বীজ শোধনের জন্য যা ব্যবহার করার পরামর্শ এই পদ্ধতিতে দেওয়া হয়েছে তা মূলত ন্যাচুইকো কালচারে ব্যবহৃত ‘অম্রুত জল’। সাথে চুনামাটি। বর্ষার পর এই বীজ শোধন মৃত্তিকা বাহিত রোগ প্রতিরোধে সহায়ক হবে বলে ধারণা করা হয়েছে।

‘আচ্ছাদন’ হিসেবে ‘মৃত্তিকা আচ্ছাদন’, ‘খড়ের আচ্ছাদন’ এবং ‘জৈব আচ্ছাদন’-এর কথা বলা হয়েছে। ‘মৃত্তিকা আচ্ছাদন’ পদ্ধতি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পুরুলিয়া জেলার কিছু অঞ্চলে আখ চাষে ব্যবহৃত হয়। ‘জৈব আচ্ছাদন’ পদ্ধতি আসলে ‘একবীজ পত্রী’ এবং ‘দ্বিবীজপত্রী’ শস্যের মিশ্র চাষ পদ্ধতি এবং এই পদ্ধতিতে নাইট্রোজেন ফিক্সিং শস্যগুলি মিশ্র চাষে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।

‘ওয়াপাসা’র ধারণা মূলত সেচের জলের দক্ষ ব্যবহার পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে শুধুমাত্র দুপুরবেলা একটা অন্তর একটা নালায় সেচ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

সুভাষ পালেকারের ‘নিখরচায় প্রাকৃতিক চাষ’ পদ্ধতি রচনায় কৌটিল্যের কৃষি পদ্ধতি, দাভালকারের ন্যাচুইকোকালচার এবং বৃক্ষায়ুর্বেদে নির্দেশিত কুনাপাজলার সূত্রগুলিই ব্যবহৃত হয়েছে।

কিন্তু বিস্তৃত কৃষি এলাকায় পদ্ধতিগুলি কতখানি কার্যকরী হচ্ছে তা মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক বা অন্য রাজ্যগুলিতে কীভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে তা ভাল করে নিরীক্ষণ করা প্রয়োজন। বিশেষত ‘বীজমৃত’ বা ‘ওয়াপসা’র ধারণা প্রশ্নাতীত নয়। তবে জৈব পদ্ধতিগুলি কৃষিতে ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি। খাদ্য সুরক্ষায় কোন পদ্ধতি কতটা সহায়ক হচ্ছে তা নথিভুক্তকরণ প্রয়োজন। পদ্ধতিটি প্রয়োজনের নিরিখে প্রশ্নাতীত নয়।