২১শে জুলাই পালন হল, তবে ধর্মতলা অঞ্চলে ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনের চওড়া রাজপথে নয়, কালিঘাটের সংকীর্ণ রাস্তা থেকে। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে তাকে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা হল দার্জিলিং থেকে দাঁতন, কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপ- বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে। প্রতি বছরের সেই চেনা ছবি- চিত্তরঞ্জন এভিনিউয়ের প্রান্ত থেকে জওহরলাল নেহেরু রোড ধরে পার্ক স্ট্রিট পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বাংলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষ, তাদের জন্য পার্টিকর্মীদের তৎপরতা, তাদের থাকা খাওয়ার আয়োজন নিয়ে সংবাদমাধ্যমে আলোচনা, সোশ্যাল মিডিয়ায় তর্ক বিতর্ক, সভা শেষ হলে ভিড়ের বহর মাপা আর আগের ভিড়গুলোর সাথে তুলনামূলক আলোচনা- মুখরোচক অনেক কিছুই হারিয়ে গেল উহান করোনা ভাইরাসজাত অতিমারির আবহে।

কিন্তু ভার্চুয়াল হলেও সভা করতেই হল কারণ তা করতেই হত। স্বাধীনোত্তর বাংলায় খাদ্য আন্দোলনের পরেই যে রাজনৈতিক আন্দোলন নিয়ে বিভিন্ন মহলে সবচেয়ে বেশী আলোচনা হয়েছে তা অবশ্যই ১৯৯৩ সালের ২১শে জুলাই-এর আন্দোলন। সেই আন্দোলন এবং তাকে দমন করতে বামফ্রন্ট সরকারের কঠোর পুলিশী ব্যবস্থা গ্রহণ, পরিণামে ১৩ জন মানুষের মৃত্যু এবং অনেক মানুষের আহত হওয়া, বিভিন্ন পরিসরে এই আলোচনা এসেছে বারবার। এই আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন সেই সময়কার যুবকংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর লক্ষ্য ছিল একটাই- বাংলার সমাজে সে সময় বামেদের, বিশেষত বামফ্রন্টের বড় শরিক সিপিএম-এর বিরুদ্ধে যে মানুষগুলোর ক্ষোভ আন্দোলনের রূপ ধারণ করতে পারছিল না তাকে একটা সংগঠিত রূপ দেওয়া। সে কাজে তিনি সফলও হয়েছিলেন। তৎকালীন কংগ্রেস নেতৃত্বের বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হওয়া, তাঁদের জনবিচ্ছিন্নতার কারণে মানুষের কাছে প্রয়োজন ছিল একজন জননেতার বা নেত্রীর। যিনি মানুষের ক্ষোভ এবং হতাশাকে আন্দোলনে পরিণত করতে পারবেন। এটা বলতে বাধা নেই, ১৯৯৩ সালের আন্দোলন মমতাকে এক ‘ফায়ারব্র্যান্ড’ রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে আরও বেশী করে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল।

একটি আন্দোলন দমনে এই ধরণের পুলিশী ব্যবস্থা এই রাজ্যের প্রশাসনের দক্ষতা, বিরোধী মতের প্রতি বাম শাসকদের মনোভাব সবকিছুকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দিতে পেরেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এটাও বলা অত্যুক্তি হবে না যে ১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার মূল ভাবনাটি তৈরি হয়েছিল পাঁচ বছর আগের এই আন্দোলনে। কারণ, যত দিন যাচ্ছিল এটা প্রমাণ হচ্ছিল যে কংগ্রেসের পক্ষে বাম শাসকদের বিরুদ্ধে সত্যিকারের গণআন্দোলন গড়ে তোলা অসম্ভব। বামবিরোধী রাজনীতিতে যে শুন্যস্থান দেখা দিয়েছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাকেই পূরণ করার চেষ্টা করছিলেন, আর ২১শে জুলাই-এর আন্দোলন তাঁকে এই লক্ষ্যে অনেকটাই এগিয়ে দিয়েছিল।

সুতরাং তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে ২১শে জুলাইকে ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। কারণ ২১শে জুলাই-এর সাথে একটা আবেগ যুক্ত। সেই আবেগ তৃণমূল নেত্রী এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত দলকে জনপ্রিয় করেছে। কংগ্রেস ভেঙে বেরিয়ে এসে একটি আলাদা দল তৈরি করার মতো একটি অত্যন্ত কঠিন কাজকে সাফল্যের মুখ দেখিয়েছে। আর ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পর দলের সাধারণ কর্মীদের সাথে দলনেত্রীর সরাসরি সংযোগের একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে ২১শে জুলাই-এর অনুষ্ঠান। জনগণের সাথে যোগাযোগের আরও বহু ক্ষেত্র বা সুযোগ থাকলেও ২১শে জুলাই-এর প্রতীকী গুরুত্বটাকে অস্বীকার করেনি তৃণমূল কংগ্রেস। আর সংবাদমাধ্যমও প্রতি বছর ২১শে জুলাই-এর শহীদ স্মরণ অনুষ্ঠানের দিকে নজর রাখত। কারণ, এই অনুষ্ঠানে প্রদত্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষণকে মনে করা হত দলের প্রতি এবং পশ্চিমবাংলার রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি বার্তা যা পরবর্তী সময়ে দলের নীতি এবং সরকারের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা বুঝতে সাহায্য করবে। তৃণমূল কংগ্রেস আজ ২২ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হলেও এই দলের কোনও সুনির্দিষ্ট সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি হয়নি বা তৈরি করা হয়নি। ফলে দলীয় কাঠামোর মধ্য দিয়ে নয়, সরাসরি সর্বোচ্চ নেতৃত্বের কাছ থেকেই বার্তা আসে সাধারণ কর্মীদের কাছে। ফলে ২১শে জুলাই-এর অনুষ্ঠানকে সকলেই গুরুত্ব দিয়েছে।

নয় বছর ক্ষমতায় থাকার পর এ রাজ্যের শাসক দল নানা বিতর্কে জড়িয়েছে। বিভিন্ন স্তরের নেতৃত্ব, বিশেষত স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলির সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় স্তরের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বারবার দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে। এ রাজ্যের রাজনৈতিক শব্দাবলীতে ঘুষ, কাটমানি এখন বহুলভাবে ব্যবহৃত হয়। দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বও এটা জানেন। প্রকাশ্যেই স্বীকার করেন। কিন্তু কারোর বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার উদাহরণ তাঁরা দেখাতে পারেননি। শক্তপোক্ত দলীয় সংগঠন থাকলে এদের হয়ত নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হত। কিন্তু তাও সম্ভব হয়নি।

২০২০-এর ২১শে জুলাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল বহু কারণে। প্রায় একক চেষ্টায় একটি রাজনৈতিক দল গঠন করার পর আজ নয় বছর ধরে সেই দল রাজ্যের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। ২০১১ সালে তৃণমূল সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এরাজ্যের বাম নেতা এবং বুদ্ধিজীবীদের পক্ষ থেকে একটি ভাবনাকে ছড়িয়ে দেওয়া হত যে এই সরকার বেশীদিন স্থায়ী হবে না। কারণ, রাষ্ট্রীয় প্রশাসন পরিচালনার মতো দক্ষতা এবং মানসিক স্থিরতা এই দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের নেই। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে একটি প্রভাবশালী সংবাদপত্র গোষ্ঠীর জনমত সমীক্ষার পর অনেকেই তৃণমূল সরকারের ‘অবিচুয়ারি’ প্রায় লিখেই ফেলেছিলেন। কিন্তু বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে। প্রমাণ হয় যে এরাজ্যের মানুষজন বাম-কংগ্রেস জোট নয়, তৃণমূল দলকেই ক্ষমতায় রাখতে চাইছে।

২০২০-এর রাজনৈতিক বাস্তবতা এখন ভিন্ন।তৃণমূল কংগ্রেস তার ২২ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের ফল এটা প্রমাণ করে দিয়েছে পশ্চিমবাংলায় তৃণমূলের প্রবল প্রতিপক্ষ হিসেবে উঠে এসেছে বিজেপি। ২০০৬-০৯ পর্বে একটি আগ্রাসী বিরোধী দল হিসেবে তৃণমূল কংগ্রেস যে ভূমিকা পালন করত বিজেপি অনেকটা সেই ধাঁচে সক্রিয় বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু দুটো দলের পার্থক্যের জায়গা হল তৃণমূল কংগ্রেস একটি শিথিল, অ-আনুষ্ঠানিক সংগঠনের দল,  যেখানে সাংগঠনিক কাঠামো কখনোই গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে না। অন্যদিকে বিজেপি একটি মতাদর্শভিত্তিক দল যার সুনির্দিষ্ট সাংগঠনিক কাঠামো আছে। সেখানে শীর্ষ থেকে তৃণমূল স্তর পর্যন্ত সকলকে শৃঙ্খলা মেনে চলতে হয়। দলটি কেন্দ্রে ক্ষমতায় এসেছে দ্বিতীয় বারের জন্য। বিগত শতাব্দীর ৫০-এর দশক থেকে ৭০-এর দশক পর্যন্ত সময়কালকে বিশিষ্ট রাজনীতিবিজ্ঞানী রজনী কোঠারী কংগ্রেস সিস্টেম বলে ব্যাখ্যা করতেন। ২০১৪ থেকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে কেন্দ্রে ক্ষমতায় আছে বিজেপি। ক্রমেই গোটা দেশে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি হিসাবে বিজেপি এবং সংঘ পরিবার ভারতীয় সমাজের বৃহত্তর অংশের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে। গোটা দেশে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে বিজেপি সিস্টেম।

আরও পড়ুন:  ক্ষমা চাইলেই মানুষ ক্ষমা করে দেবে রাজনীতি এত সহজ পথে চলে না

বাংলাও যে তার বাইরে নয় তার প্রমাণ দেখা গেছে ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে। এ রাজ্যে মোট ৪২টি আসনের মধ্যে ১৮টি আসন জিতে (এ ছাড়াও তিনটি আসনে অল্প ব্যবধানে হেরে) আর ৪০ শতাংশের বেশী ভোট পেয়ে বিজেপি পশ্চিমবাংলায় তৃণমূলের প্রবল প্রতিপক্ষ। ২০১৪’র লোকসভা নির্বাচনের সময় থেকেই দুটি দলের তিক্ততা চরমে। ২০১৬’র লোকসভা নির্বাচনের পর এই তিক্ততা আরও বেড়েছে। এখন বিজেপির পাখির চোখ ২০২১-এর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্মস্থান পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার যে সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য আছে এটা বিজেপি ভালোই বোঝে। ইতিমধ্যেই বিজেপির দীর্ঘদিনের এজেন্ডা জম্মু ও কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বিলোপ, তিন তালাক বিলোপ কার্যকর হয়েছে এবং অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণ শুরু হতে চলেছে। অর্থাৎ বিজেপি তার রাজনৈতিক সাফল্যের প্রায় সর্বোচ্চ শিখরে আছে। পশ্চিম বাংলায় দলের সংগঠন এখন আগের চেয়ে অনেক মজবুত। কংগ্রেস, সিপিএম-সহ বামফ্রন্ট এবং তৃণমূল কংগ্রেস সব দল এরাজ্যে ক্ষমতায় এলেও বিজেপি কখনও ক্ষমতায় আসেনি। অর্থাৎ এখনও এই দল পরিক্ষিত নয়। আগামী বিধানসভা নির্বাচনের লড়াই অনেক সুবিধাজনক অবস্থান থেকেই শুরু করছে বিজেপি।

অন্যদিকে ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনের আগে তৃণমূল কংগ্রেসকে লড়তে হবে অনেকগুলো সমস্যা সঙ্গে নিয়ে। আগেই বলেছি তৃণমূল কংগ্রেস দলটি শক্তপোক্ত সংগঠনের উপর প্রতিষ্ঠিত নয়। গত ২২ বছরে ক্রমোচ্চ শ্রেণীবিন্যস্ত সংগঠন গড়ে তোলার চেষ্টাও নজরে পড়েনি। দলটি কোনও মতাদর্শকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেনি। এই দল প্রতিষ্ঠার প্রধান লক্ষ্যই ছিল সিপিএম নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্টকে ক্ষমতা থেকে সরানো। সেই কাজে দলটি সফল হয়েছে। কিন্তু মতাদর্শ না থাকলে কোন‍ও দলকে দীর্ঘদিন এক রাখা কঠিন, বিশেষত সংকটকালীন সময়ে। ক্ষমতা যে কোনও দলে আপাত ঐক্য ধরে রাখতে সাহায্য করে, কিন্তু দীর্ঘকালীন অস্তিত্ব এবং প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখার জন্য চাই মতাদর্শ।

বাম আমলে দলের মাঝারি’ বা নীচের স্তরে এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলিতে দুর্নীতি সমাজের সর্বস্তরে বামনেতাদের আধিপত্যবাদে বিরক্ত মানুষ তৃণমূল কংগ্রেসকে বেছে নিয়েছিল। কারণ, তৃণমূল নেত্রীর সাধাসিধে জীবনযাপন এবং সততার ইমেজ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়েছিল। বিধান চন্দ্র রায়ের পর বাংলা পেয়েছিল এক জনমোহিনী নেতৃত্ব। সাধারণভাবে জনমোহিনী নেতৃত্বের সংগঠনের প্রয়োজন পড়ে খুবই কম। একদিকে নেতা বা নেত্রী (leader) অন্যদিকে জনগণ (mass)- যোগাযোগ হয় সরাসরি। বিগত শতাব্দীর ২০ এবং ৩০-এর দশকে জার্মানি কিংবা ইটালীতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং জনসাধারণের সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে পার্টি সংগঠনের ভূমিকা ছিল খুবই কম। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এর প্রভাব রাজনৈতিক ব্যবস্থার উপর ভালো হয়নি।

নয় বছর ক্ষমতায় থাকার পর এ রাজ্যের শাসক দল নানা বিতর্কে জড়িয়েছে। বিভিন্ন স্তরের নেতৃত্ব, বিশেষত স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলির সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় স্তরের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বারবার দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে। এ রাজ্যের রাজনৈতিক শব্দাবলীতে ঘুষ, কাটমানি এখন বহুলভাবে ব্যবহৃত হয়। দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বও এটা জানেন। প্রকাশ্যেই স্বীকার করেন। কিন্তু কারোর বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার উদাহরণ তাঁরা দেখাতে পারেননি। শক্তপোক্ত দলীয় সংগঠন থাকলে এদের হয়ত নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হত। কিন্তু তাও সম্ভব হয়নি। এর সাথে যুক্ত হয়েছে বিতর্ক, রাজ্যপালের সাথে রাজ্যপ্রশাসনের দ্বন্দ্ব, বিরোধীদের মতপ্রকাশ কিংবা আন্দোলনের সুযোগ ক্রমশ কমে যাওয়া। রাজ্যের শাসক দলের প্রশাসন পরিচালনার পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক ক্রমবর্ধমান।

এই পেক্ষাপটে রাজ্যের শাসক দলকে আগামী ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে দলের কর্মী সমর্থকদের কাছে সর্বোচ্চ নেতৃত্বের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য ২০২০’র ২১শে জুলাই-এর মঞ্চকে ব্যবহার করার প্রয়োজন ছিল। ভার্চুয়াল র‍্যালির মাধ্যমে তারা সেটাই করতে চেয়েছেন।

একদিকে নিজের সাফল্যের খতিয়ান দেওয়া অন্যদিকে পরের নির্বাচনে জয়লাভ করলে নতুন কিছু করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া- রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় এগুলি খুবই চেনা বিষয়। উহান করোনা ভাইরাসজাত মহামারি মোকাবিলায় সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা, আর আমফান ত্রানে দুর্নীতির অভিযোগ বাংলার রাজনীতিতে সাম্প্রতিককালের বহুলচর্চিত বিষয়। সরকারের পক্ষে, বিপক্ষে অজস্র যুক্তি সাজানো হচ্ছে, আগামীদিনেও হবে। শাসকদলের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আগামীদিনে সবাইকে বিনা পয়সায় রেশন দেওয়া কতখানি সম্ভব (যেখানে সরকারি কর্মচারীদের কেন্দ্রীয় হারে ডিএ’র দাবি অর্থের অভাবে মানা যায় না, যেখানে রাজ্য সরকারের ধার সাড়ে তিন লক্ষ কোটি টাকার বেশী) তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, উঠছেও। তাই ২১শে জুলাই-এর বক্তৃতায় এই বিষয়গুলিকে খুব বেশী আলোচনায় আনার প্রয়োজন নেই। ২১শে জুলাই-এর বক্তৃতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটা হল আঞ্চলিক রাজনীতিকে নতুন করে সামনে আনা। ‘‘বাংলা শাসন করবে বাংলার মানুষ, কোনও বহিরাগত নয়। বাংলা শাসন গুজরাট করবে না’’- এই বক্তব্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে নয়া আঞ্চলিকতার ভাবনার উৎস। শক্তিশালী কেন্দ্রের ধারনার সমর্থক বিজেপির আগামী দিনে এ রাজ্যে প্রচারের প্রধান বক্তব্যই হতে পারে ‘‘কেন্দ্রে ও রাজ্যে একই দল ক্ষমতায় থাকলে এ রাজ্যের উন্নতি সম্ভব।’’ তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব ‘বাংলার অস্মিতা ‘ দিয়ে সেই ধারণাকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করবেন ২১শে জুলাই-এর বক্তৃতায় এটা স্পষ্ট হয়েছে। এই কারণেই এবার ২১শে জুলাই-এর বক্তৃতার ৯০ শতাংশ জুড়ে তীব্র বিজেপি বিরোধিতা, তীব্র কেন্দ্র বিরোধী জেহাদ, রাজ্যের স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধিকার নিয়ে নতুন ন্যারেটিভ তৈরির চেষ্টা। আগামী বিধানসভা নির্বাচনের গুরুত্ব বোঝা গেল ঠিক দুদিন পরে ২৩শে জুলাই তৃণমূল কংগ্রেসে সাংগঠনিক রদবদলে। এখানেও লক্ষ্য একটাই- দলের বিভিন্ন কমিটিতে প্রত্যেককে ঠাঁই দিয়ে ভাঙন রোধ। কমিটিগুলোর এক্তিয়ার, কার্যকলাপের ক্ষেত্র কোনটাই ‘well-defined’ নয়। কারণ, এদের ভূমিকার উপর দলের সাফল্য নির্ভর করে না। কোনওদিন করেও নি।

দলের সাফল্য নির্ভর করবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনমোহিনী শক্তি এখনও কতটা বজায় আছে তার উপর। দশ বছর ক্ষমতায় থাকার পরও দলকে টেনে নিয়ে যেতে হবে সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই। তবে পথ এবার কঠিন, খুবই কঠিন।