সারা পৃথিবী এখন করোনাময়। একনাগাড়ে ২ মাসের বেশি সময় মানুষ ঘরবন্দি ছিলেন। এখন খানিকটা ফাঁসটা আলগা হয়েছে (যদিও রাজ্যের কন্টেনমেন্ট জোনগুলিতে ফের লকডাউন শুরু হয়েছে)। বন্দিদশার কয়েকটি অভিজ্ঞতা তুলে ধরার। সেগুলো মজার এবং হৃদয় বিদারক। যেদিন বিকাল ৫টা থেকে লকডাউন চালু হল, প্রথমে সবাই বুঝতেই পারেনি। আমিও না। সবাই আমাকে বলছিলেন লকডাউন কি, হবে কিনা অথবা কেমন হবে। আমি একটা পুরনো গল্প বলেছিলাম। একবার বহরমপুর শহরে ৪৮ ঘণ্টার কার্ফু জারি করা হয়েছিল। শহরের মানুষ দলবেধে রাস্তায় নেমেছিলেন কার্ফু কি তা দেখার জন্য! এই মহোৎসবে মহিলারাও বাদ যাননি। কার্ফুর উদ্দেশ্যটাই ফর্দাফাই।

মনে হয়েছিল তেমনই হবে। কিন্তু কয়েকঘণ্টা পর বোঝা গেল ব্যাপার কতগুরুতর। ট্রেন-ট্রাম বন্ধ, বাস, গাড়ি ঘোড়া বন্ধ, আপিস-আদালত-স্কুল-কলেজ, বাজার-হাট বন্ধ। মায় শ্মশান, কবরখানাও বাদ যায়নি। মানুষের চিন্তা বাঁচবো কিনা? বাঁচলে খাব কি? যে যে ভাবে পারলো হুড়মুড় করে বাজারে গেল। আনাজপাতি কিনে ফেলল। সেগুলো রাখতে বাড়িতে ফ্রিজ এল বড় আকারের। রান্নার লোক নেই। কাপড় কাচার লোক নেই। ধোপা নাপিত বন্ধ। রাস্তাঘাট শ্মশানের বাড়া। এক হপ্তা বাদে টের পাওয়া গেল লকডাউন কাকে বলে।

কয়েকদিন খবরের কাগজ বন্ধ। সে আর এক বিড়ম্বনা। অনেকেই ভয়ে কাগজ নেওয়াই বন্ধ করে দিলেন। একজন কাগজের হকার আমাকে ফোন করলেন, ‘‘কাকু বাজারে এক কোণে সব্জী নিয়ে বসছি। দরকার হলে বলবেন।’’ বুঝতে অসুবিধা হল না খড়কুটো ধরে বাঁচার চেষ্টা করছে। একদিন পুরনো সময়ের আমার এক গাড়ির চালক হঠাৎ সকালে দরজায় দাঁড়িয়ে। ‘‘দাদা আপনার জন্য ছোট মাছ এনেছি। নেবেন?’’ কি করা নিতে হল। কেটে দিতে পারল না। কারণ সে কাটতে জানে না। সেদিনই প্রথম মাছ নিয়ে রাস্তায় নেমেছে। কতজনের জীবন পাল্টে দিল ক’দিনেই।

কেউ বলছে হোমিওপ্যাথি খান, কেউ বলছে নাকে সর্ষের তেল দিন, কেউ বলছে শুকনো বেলপাতা মধু দিয়ে খান, তাতে দারুচিনি মেশান- ফলাফল নিশ্চিত! এ ধরাধামে আপনি থাকছেন স্যার। আমরা আছি। সব বুজরুকি অবলীলায় মানুষ মেনে নিচ্ছে। আমরা ভালোবাসায় এক হতে পারিনি। মৃত্যুভয়ে এক হয়েছি।

বাড়িতে বসে আমার সময় কাটানো আরও সমস্যা। না পারি রান্না করতে, না পারি ঘর ঝাট দিতে। ঠিক করলাম না পড়া বইগুলো পড়বো। যদিও তা সব হাতের কাছে নেই। যা আছে তা কম না। টানা ২ মাস প্রতিদিন ৭ থেকে ১১ ঘণ্টা পড়েছি। মাথা ধরেছে, তবুও থামিনি। আমার মনে পড়ছিল হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষার আগে ছাড়া এত আদা জল খেয়ে অকাজের পড়া আর কোনওদিন পড়িনি। লেখাতেও মনোনিবেশ করেছিলাম। তার অগ্রগতি বেশ ভালো। সে সব কথা পরে হবে।

এদিকে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। সামান্য কাশি হলেও প্রাণ আত্মারাম খাঁচা ছাড়া। খবর পেলাম পরিচিত একজনের জ্বর হয়েছে। আর যায় কোথায়? সবাই ফ্ল্যাট থেকে টেনে বের করে দেয় আর কি? শেষকালে ক্যালপল ৬৫০ ভরসা। তাতেই জ্বর ব্যাটা পালালো। গলাব্যথা হলে আর কেউ বলছে না। এখনও তাই চলছে।

এবার দূরদর্শন। বলিহারি যায়। অষ্টপ্রহর সবাইকে ভয় দেখিয়ে যাচ্ছে। গোষ্ঠী সংক্রমণ হল বলে। চুপচাপ বাড়িতে থাকুন। এটা করুন, ওটা করুন। জুলাই-সেপ্টেম্বর-এ সর্বাধিক হবে। হাসপাতালে বেড নেই। বেসরকারিতে চিকিৎসার লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভয় দেখিয়ে শেষে ‘অশ্বথ্থামা হত ইতি গজঃ’র মতো বলছে- ভয় পাবেন না। কারোনা নিয়ে আমাদের বাঁচতে হবে।

সারা পৃথিবী সাবাড় হওয়ার দিকে এগিয়ে চলেছে। কে বাঁচবে কে মরবে কেউ জানে না। এই ফাঁকে মানুষকে ধোকা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। কেউ বলছে হোমিওপ্যাথি খান, কেউ বলছে নাকে সর্ষের তেল দিন, কেউ বলছে শুকনো বেলপাতা মধু দিয়ে খান, তাতে দারুচিনি মেশান- ফলাফল নিশ্চিত! এ ধরাধামে আপনি থাকছেন স্যার। আমরা আছি। সব বুজরুকি অবলীলায় মানুষ মেনে নিচ্ছে। আমরা ভালোবাসায় এক হতে পারিনি। মৃত্যুভয়ে এক হয়েছি। জীবদ্দশায় এমন কুৎসিত ঘটনা দেখতে হবে কোনওদিন ভাবিনি।

৭-১০ দিন থেকেই টের পেলাম নিভৃতবাস কত কষ্টকর। এবার ফোনের উপর অত্যাচার। আত্মীয় স্বজন, বন্ধুবান্ধব, তাদের ছেলেমেয়ে’র বয়স কম। দেশের মধ্যেই অন্য রাজ্যে থাকে, তাদের বাড়ির জন্য মনখারাপ করছে- ফিরিয়ে আনতে হবে। কেউ ব্যাঙ্গালোর, কেউ ত্রিবান্দ্রম বা চেন্নাই বা দিল্লি। যারা বছরের পর বছর বাড়ি আসেনি। সপ্তাহে মা বাবাকে একটা ফোন করতো কিনা সন্দেহ। তাদের এবার মন উচাটন। মন কেমন করছে। তাদের আসতে হবে। ফোনে কান্নাকাটি। তবুও লকডাউন নাড়ির টান ফিরিয়ে দিয়েছে এটাই ভরসা।

একটা মজার ব্যাপার হয়েছে। পুরনো বন্ধুরা এই অবসরে ফোন করেছে। মজার ব্যাপার হল আমার এক বন্ধু যাকে আমি শেষ ৩০ বছর আগে দেখেছি সে ফোন করেছিল। হতবাক হয়েছি। কার কাছে ফোন নম্বর পেল বলেনি। পাক্কা ৪৫ মিনিট কথা বলেছে। জীবনের বহু হীরক খণ্ড তুলে ধরেছিল। সেদিনই আমি লকডাউনের প্রতি সব বিরক্তি ঝেড়ে ফেলেছিলাম।

সবার চেহারা পাল্টে দিল করোনা। গোঁফের মর্যাদা নেই, দামী ঠোঁট পালিশ লাগানোর তাড়া নেই। সবাই মাস্ক পরে আছে। ওষ্ঠরঞ্জনীর দরকার হবে কেন? একটা প্রশ্ন মনে আসে- এখন কনে দেখতে গিয়ে মাস্ক খুলতে বলা হচ্ছে, না হচ্ছে না? যাই হোক আমরা সবাই মাস্কযুগে ঢুকেছি। সহজে কাউকে চিনতে পারছি না। তারও মজা কম নয়। আজ এই পর্যন্তই থাক। বাকি কথা পরে হবে।