১৫ই আগষ্ট ১৯৪৭‘এ প্রায় ২০০ বছরের ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসনের হাত থেকে ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভ করে। মূলভূখণ্ড তিনভাগে ভাগ হয়, সৃষ্টি হয় ভারত, পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্থান। দেশকে পরাধীনতার শৃঙ্খল  থেকে মুক্ত করতে  হাজার হাজার মানুষ স্বতস্ফূর্তভাবে আত্মবলিদান দিয়েছিলেন। তাঁদের আত্মত্যাগের এবং দীর্ঘ সংগ্রামের স্মৃতি ভারতের স্বাধীনতা লাভের ইতিহাসের সঙ্গে একীভূত হয়ে গেছে। আজ ৭৪ তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপন লগ্নে সেই সব স্বাধীনতা সংগ্রামীদের স্মরণ করা প্রয়োজন যারা ব্যক্তিস্বার্থের উর্দ্ধে উঠে দেশকে স্বাধীন করেছিলেন।

ইংরেজ বণিকরা বাণিজ্য করতে ভারতে এসেছিলেন। অধিক মুনাফা লাভের আশাই তাঁদের বণিক থেকে প্রশাসকে পরিণত করেছিল। তারা ধীরে ধীরে প্রশাসক থেকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিতে পরিণত হন। রাজ্য জয় বা শাসনব্যবস্থা হাতে নিয়েই তাঁরা ক্ষান্ত ছিলেন না। নিজেদের প্রধান্য কায়েম করতে ‘সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ’কে হাতিয়ার করলেন। অর্থাৎ ভারতীয় সংস্কৃতির উর্দ্ধে পাশ্চাত্য সভ্যতা-সংস্কৃতিকে প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট হলেন। সমাজ, ধর্ম, আচার-আচরণ, শিক্ষা-সংস্কৃতি সব দিক থেকে ভারতবাসী কতটা অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং পশ্চাৎপদ তা তাঁরা দেখালেন। নিজেদের প্রয়োজনে, নিজেদের সুবিধা মতো ভারতবর্ষের ইতিহাসের যুগ বিভাজন সৃষ্টি করলেন, দেখালেন আর্যদের আগমনে প্রাচীনযুগ, মুসলিম আগমনে মধ্যযুগের সূচনা ঘটল এবং বৃটিশরা নিয়ে আসলেন আধুনিক যুগ। ভারতের অতি প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতা ও তাঁর আদিবাসিন্দারা অনেকখানি গুরুত্ব হারালেন। আর আর্য-অনার্যের বিভাজন সকলেরই জানা, সেখান বহিরাগত আর্যদের শ্রেষ্ঠ দেখানো হল। এপ্রসঙ্গে মনে রাখা প্রয়োজন যে, ভারতবর্ষে শুধু আর্য, মুসলিম বা বৃটিশরাই আসেননি, যুগে যুগে বাহ্লীক, গ্রীক, মধ্য এশিয়ার যাযাবর নানা গোষ্ঠী,নানা সংস্কৃতি , নানা ভাষাভাষী মানুষ এসেছেন, মিলেছেন ভারতীয় সভ্যতায়, ভারতবর্ষ ‘মহামানবের সাগরতীরে’ এক মিলন ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

প্রাচীন যুগে যেসব বহিরাগত জাতি ভারতে প্রবেশ করেছে, ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁরা একাত্ম হয়েছেন এবং ভারতীয় সভ্যতা-সংস্কৃতিও তাঁদের গ্রহণ করেছে। কিন্তু ইসলাম বা খৃস্টান ধর্মের অনুগামী যারা ভারতে এসেছিলেন তাঁরা এদেশে ক্ষমতা দখল করেছেন এবং শাসক হয়ে উঠেছেন।  ইংরেজ শাসকদের মতো, মুসলমান শাসকরা কিন্তু ঔপনিবেশিক শক্তি ছিলেন না, না তো তাঁরা ‘সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ’ এর উপযুক্ত উদাহরণ হয়ে উঠতে পেরেছেন। সুলতান থেকে মোঘল শাসক সুদীর্ঘকাল ভারতে তাঁদের আধিপত্য কায়েম রেখেছিলেন। কখনও গোঁড়ামি-কখনও উদারতা মধ্যযুগের রাজনীতিতে আবর্তিত হয়েছে। মধ্যযুগে হিন্দু এবং মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ বহু দিন পাশাপাশি বসবাস করেছেন, উভয় সংস্কৃতি একে অন্যকে সমৃদ্ধ করেছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে শাসকরা ভারতীয় প্রাচীন শাস্ত্র, সাহিত্য, প্রচলিত ঐতিহ্যের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন।  কিন্তু মোঘল শাসনব্যবস্থা যত দুর্বল হয়েছে মাথাচাড়া দিয়েছে বিচ্ছিন্ন আঞ্চলিক শক্তি, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, নিজেদের মধ্যে উচ্চনীচ ভেদাভেদ, লুণ্ঠন- এই নৈরাজ্যের সুযোগ নিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন ইংরেজরা, কায়েম করেছেন নিজেদের আধিপত্য।

ইংরেজদের হাত থেকে তো মুক্তি পেলাম, কিন্তু ইংরেজরা ভারতবাসীর মনে বিভাজনের যে বিষবৃক্ষ বপন করেছিলেন, স্বাধীনতা প্রাপ্তির ৭৪তম বর্ষে আমাদের মনে তা মহীরুহ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা অনেকাংশেই প্রকৃত ইতিহাসকে অস্বীকার করি, কিন্ত ভুলে যাই ‘হোয়াটসঅ্যাপ’-‘ফেসবুক’এ ঘুরে বেড়ানো তথ্য নয়, সঠিক ইতিহাসই পারে অজ্ঞনতা ও অজ্ঞতার হাত থেকে আমাদের মুক্তি দিতে। আর এই সবের মধ্যে দিয়ে ব্যহত হচ্ছে ভারতবর্ষের সুপ্রাচীন ঐতিহ্য, সংকীর্ণ হচ্ছে আমাদের চিন্তার পরিধি, পরবর্তী প্রজন্ম ‘মানবতা’, ‘সৌহার্দ্য’ ও ‘সম্প্রতি’ এই শব্দগুলি অনুভব করতে শিখবে না, শুধু অভিধানেই খুঁজে পাবে হয়ত। যার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকবে না- দেশের সার্বিক উন্নয়ন থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য পরিষেবাগুলিও।

ইংরেজ বণিকরা প্রশাসক হয়ে উঠতে সবচেয়ে বেশি সহায়তা পেয়েছিলেন হিন্দুদের থেকে। পাশ্চাত্য শিক্ষা –সংস্কৃতি গ্রহণ করে তাঁরা সামনের দিকে এগিয়ে চললেন। মুসলমানরা বহুদিন পর্যন্ত পাশ্চাত্য সংস্কৃতি-শিক্ষার প্রতি বিমুখ ছিলেন। হিন্দুদের অগ্রগতি এবং ইংরেজদের তোষণনীতি মুসলমানদের পাশ্চাত্য শিক্ষা-সভ্যতার প্রতি আকৃষ্ট করে। ইংরেজরা শুধু নিজেদের প্রয়োজনে ইতিহাস রচনা করেননি, সমাজে-বিভেদ বৈষম্যকে বহুমাত্রায় বৃদ্ধি করেছিলেন। জনগণনার ভিত্তিতে সমাজে জাত-বর্ণের বিভাজনকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছিলেন। ইংরেজদের ক্ষমতা দখলের পর হিন্দু-মুসলমান উভয়েই ইংরেজদের কাছে পরাস্ত দেশীয় প্রজা রূপে পরিগণিত হন। নিজেদের সুবিধার জন্য ইংরেজরা হিন্দু-মুসলমানের পৃথক অস্তিত্বকে ‘divide and rule’ নীতির দ্বারা দুটি সদা বিবাদমান জাতিসত্তায় পরিণত করেন। বহু লড়াই হিন্দু-মুসলমান একসঙ্গে লড়ছে, এর ফলে ইংরেজ সরকার ভীত হয়। হিন্দু-মুসলিম সমাজকে আলাদা আলাদাভাবে হাতে রাখতে, ইংরেজরা স্বতন্ত্র সুবিধা দেওয়ার আশ্বাস দিতে শুরু করেন।

ইংরেজ সরকার যে বিভেদ নীতিকে হাতিয়ার করেছিলেন তাতে গোঁড়ামি ও মৌলবাদের প্রভাব বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কারের ফলে হিন্দু স্বার্থ বিপন্ন হল, লখনউ চুক্তি উত্তরপ্রদেশের মুসলমানদের অনুকূল কিন্তু বাংলার মুসলমানদের পক্ষে নয়। অনেক হিন্দু ভয় পেলেন গান্ধীজীর খিলাফত-অসহযোগ আন্দোলনের পরাভবে। এই পরাভবের পরিণাম- সাম্প্রদায়িক পশ্চাদঘাত। ১৯২৪-১৯২৮ একদিকে হিন্দুদের শুদ্ধিকরণ সংগঠনের তোড়জোড়, অন্যদিকে মুসলমানের তাঞ্জিম তবলিগ প্রতিক্রিয়া সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ভয়াবহতা বৃদ্ধি করে। অধ্যাপক সুমিত সরকার দেখিয়েছেন, দাঙ্গার দুটি স্তর ছিল- একটি উচ্চবর্গীয়, অপরটি নিম্নবর্গীয়। নিম্নবর্গীয়দের দাঙ্গার মূল কারণ ছিল জমিদার-আমলাদের শোষণ অত্যাচার, এর সঙ্গে খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি, মহামারির প্রকোপ ইত্যাদি। আর কার্জনের বঙ্গভঙ্গের ফলে ওপর তলার হিন্দু মুসলমান ভদ্রলোকেদের মধ্যে রাজনৈতিক ক্ষমতা নিয়ে বিরোধ নতুন ভাবে সাম্প্রদায়িকতায় ইন্ধন জোগায়। এই ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিষ দেশভাগ এবং তৎপরর্বতী রাজনীতির চালিকা শক্তিতে পরিণত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘ভারতবর্ষের ইতিহাস’-এ সচেতন করেছিলেন যে,

‘যে সমাজে শৃঙ্খলা আছে, ঐক্যের বিধান আছে, সকলের স্বতন্ত্র স্থান ও অধিকার আছে, সেই সমাজেই পরকে আপন করিয়া লওয়া সহজ। পরকে কাটিয়া মারিয়া খেদাইয়া নিজের সমাজ ও সভ্যতাকে রক্ষা করা, নয়, পরকে নিজের বিধানে সংযত করিয়া সুবিহিত শৃঙ্খলার মধ্যে স্থান করিয়া দেওয়া, এই দুই রকম হইতে পারে। য়ুরোপ প্রথম প্রণালীটি অবলম্বন করিয়া সমস্ত বিশ্বের সঙ্গে বিরোধ উন্মুক্ত করিয়া রাখিয়াছে- ভারতবর্ষ দ্বিতীয় প্রণালী অবলম্বন করিয়া সকলকেই ক্রমে ক্রমে ধীরে ধীরে আপনার করিয়া লইবার চেষ্টা করিয়াছে। যদি ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা থাকে , যদি ধর্মকেই মানবসভ্যতার চরম আদর্শ বলিয়া স্থির করা যায়, তবে ভারতবর্ষের প্রণালীকেই শ্রেষ্ঠতা দিতে হইবে।’

দুর্ভাগ্যজনকভাবে রবীন্দ্রনাথ যা বলেছিলেন তা আমরা আজও বুঝে উঠতে বা বোঝার চেষ্টা করতে পারলাম না। ইংরেজদের হাত থেকে তো মুক্তি পেলাম, কিন্তু ইংরেজরা ভারতবাসীর মনে বিভাজনের যে বিষবৃক্ষ বপন করেছিলেন, স্বাধীনতা প্রাপ্তির ৭৪তম বর্ষে আমাদের মনে তা মহীরুহ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা অনেকাংশেই প্রকৃত ইতিহাসকে অস্বীকার করি, কিন্ত ভুলে যাই ‘হোয়াটসঅ্যাপ’-‘ফেসবুক’এ ঘুরে বেড়ানো তথ্য নয়, সঠিক ইতিহাসই পারে অজ্ঞনতা ও অজ্ঞতার হাত থেকে আমাদের মুক্তি দিতে। আর এই সবের মধ্যে দিয়ে ব্যহত হচ্ছে ভারতবর্ষের সুপ্রাচীন ঐতিহ্য, সংকীর্ণ হচ্ছে আমাদের চিন্তার পরিধি, পরবর্তী প্রজন্ম ‘মানবতা’, ‘সৌহার্দ্য’ ও ‘সম্প্রতি’ এই শব্দগুলি অনুভব করতে শিখবে না, শুধু অভিধানেই খুঁজে পাবে হয়ত। যার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকবে না- দেশের সার্বিক উন্নয়ন থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য পরিষেবাগুলিও। রোজগার নেই বহু মানুষের, চিকিৎসার জন্য খরচ বাড়ছে পাল্লা দিয়ে, পাশের মানুষটি অসুস্থ হলে মুখ ফেরাচ্ছেন অন্যরা, অমানবিকতার চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত কি আমরাই তৈরি করছি না? – দাঁড়ান ‘ধর্ম’ চলছে দেশে – এসব কেউ শুনবে না। তাহলে বলুন ভুলেছেন-‘জীবে দয়া করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর’?