‘মার্কস নেই’। তখন লকডাউনের প্রদোষকাল। বাড়িতে তখন একান্তই নিভৃতবাস। কি একটা প্রয়োজনে বাড়ির বাইরে যেতে হল। সামান্য দূরে। পথে পাড়ার মুদিখানা দোকানটি পড়ে। এক পাল্লা খোলা। পাড়ার লোকের একমাত্র ভরসা। তারই দরজায় বড় বড় অক্ষরে লেখা ‘মার্কস নেই।’ দু’বার চোখ রগড়ালাম। ঠিক যা লিখেছি তাই। বহুদিন আগেই ভদ্রলোক গত হয়ছেন। আজ সেটা জানান দেবার কি আছে? একটু পরেই শব্দটি কি বুঝতে পারলাম। মাস্ক। নিজের মনেই এমন কুলকুল করে হেসে উঠলাম যে কেমন একটা অশোভন মনে হল। সেই সেদিনের মাস্ক যে এমন জীবন সঙ্গিনীর মতো হয়ে উঠবে তা তখনও বুঝতে পারিনি। এখন হাড়ে হাড়ে বুঝেছি।

একখন্ড কাপড়ের কি মহিমা!

এতদিন সিনেমায় বা দুরদর্শনে ডাক্তারদের অপারেশন টেবিলের সামনে সবুজ রঙের একখন্ড কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে রাখতে দেখতাম। সেটাই আমরা পরে জীবন কাটাচ্ছি। হায় বিধি!

যখন বোঝা গেল এটা আমাদের আরও কতদিন বেধে রাখতে হবে সেটা কেউ বুঝতে পারছে না। তখন মাস্ককে কেমন করে উপভোগ করতে হয় তার প্রক্রিয়া প্রকরণ শুরু হয়ে গেল। নানারকমের মাস্ক বাজারে ক্রমে ক্রমে আসতে লাগলো। বাধ্য হয়ে দেশবাসী মুখবন্ধনী নিতে বাধ্য হচ্ছে।

বেদনা বিধূর এই পৃথিবীতে, মানুষের পৃথিবীতে আজ মানুষ বড় অসহায়। মাস্ক পরা মানুষ দেখলেই তা বোঝা যায়।

তবে জনগণের বলিহারি যায়। চোর-পুলিশ খেলা চলছেই। বাইক চালকদের মাথায় হেলমেট পরার মতো। মাথায় না পরে হেলমেট গাড়িতে আটকে রাখে। এখানেই মাস্ক মুখে না পরে থুঁতনিতে আটকে রাখে।

অন্যদের কথা বলতে পারবো না। তবে বাঙালি মাস্কেও স্টাইল ছাড়া থাকতে পারলো না। ভাবখানা এমন- যদি মরি, স্টাইল করেই মরবো। রাজনৈতিক দলগুলি মাস্কে দলীয় পতাকা বা চিহ্ন লাগিয়ে মাস্ক তৈরি করার অর্ডার দিল। যেমন দলীয় পতাকা বাজার থেকে কিনতে পাওয়া যায়। লাল, সবুজ, নীল সাদা সব রঙের মাস্ক বাজারে এসে গেছে। কোনটা তিন লেয়ার, কোনটা এন ৯৫ তা নিয়ে চরম বিতর্ক। কিন্তু খরচের কথা কেউ ভাবছে না। ১০ থেকে ৫০০টাকা দাম। গরীব মানুষের কথা ভাবছে না। ছোটবেলায় গ্রামে দেখতাম গরু বা মহিষের মুখে কঞ্চির তৈরি বুলি পরিয়ে দেওয়া হত। যাতে অন্যের ক্ষেতের ফসল খেয়ে ফেলতে না পারে। গরু, মহিষগুলো যেন এখন হাসাহাসি করছে। বহুদিন ধরে মানুষ পরের ক্ষেতে খেয়ে যাচ্ছে। তাই তাদের মুখে বুলি পরানো হয়েছে। মানুষের আরও বহু জায়গায় বুলি পরানো দরকার বোধ হয়। বেদনা বিধূর এই পৃথিবীতে, মানুষের পৃথিবীতে আজ মানুষ বড় অসহায়। মাস্ক পরা মানুষ দেখলেই তা বোঝা যায়।

তবে জনগণের বলিহারি যায়। চোর-পুলিশ খেলা চলছেই। বাইক চালকদের মাথায় হেলমেট পরার মতো। মাথায় না পরে হেলমেট গাড়িতে আটকে রাখে। এখানেই মাস্ক মুখে না পরে থুঁতনিতে আটকে রাখে। আইন বা নিয়ম ভাঙ্গা মানুষের রক্তে মিশে আছে। আবার দেখি যারা মাস্ক পরা উচিত বলে জ্ঞানগর্ভ ভাষণ দিচ্ছেন তাঁদের মুখে মাস্ক নেই। এদিক দিয়ে সর্বোচ্চ স্থানে দেশের প্রধানমন্ত্রী ভাষণ দেন- মাক্স পরেন না। গলায় নিত্য নতুন স্টাইলের উড়ান পরেন। সেটা ১-২ মিনিট মুখে দেন। তারপর খালি মুখে ‘মন কী বাত।’ অবশ্য তিনি বিগত ১৫০ দিন একবার ছাড়া নিজ বাসভবনের বাইরে আসেননি।

দেশে কত মাস্ক দিনে তৈরি হচ্ছে এখন একটা সংবাদ। অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন একাজে যুক্ত। বহু গ্রামে দরজি’র যন্ত্রের ঘরঘর শব্দ শোনা যাচ্ছে। সব চাইতে মজা হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়াতে নানা রঙের মাস্কের বিজ্ঞাপন পাওয়া যাচ্ছে। যাদের অনলাইন বাজার করা অভ্যাস তারা দেখতে পাচ্ছেন সেখানে মাস্কের ছড়াছড়ি।

ঠেলায় পড়লে বিড়াল গাছে ওঠে। শেষ পর্যন্ত অসীমশক্তিধর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাহেবকেও মাস্ক পড়তে হল। তিনি গোঁ ধরেছিলেন পরবেন না। মিলিটারিদের চাপে পরলেন। বেলারুশের প্রধানমন্ত্রী মাস্ক না পরার জন্য ১৩ হাজার টাকা জরিমানা দিলেন। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর তো জীবনসংশয় হয়েছিল। ভারত বা বাংলার রাস্তায় আরও মজার এবং হৃদয় বিদারক দৃশ্য দেখা গেছে- মাস্ক না পরলে পুলিশ কানধরে উঠবোস করাচ্ছে। এখন পর্যন্ত মেয়েদের উঠবোস করতে দেখিনি। বোধহয় তাদের ছাড় দেওয়া হয়েছে।

কত পরিচয় নিয়ে আমরা বাঁচি। মাস্ক আমাদের আর একটা পরিচয় এনে দিল। ইতিমধ্যেই দু-একজন বলতে শুরু করেছে ‘‘মইনুলদা শুধু সার্জিক্যাল মাস্ক পরেন।’’ হ্যাঁ প্রথম দিন থেকে এটাই পরছি। গ্রামের দিকে যাই, সবাই অবাক হয়। অযথা মুখ ঢাকা কেন? তারা কেউ পরেন না। সত্যি, জীবন বড় বিচিত্র ও বহুপথগামী।

আমারও মনে হয় আর কত দিন? এভাবে চলবে কদিন? এক তরুণ ডাক্তার বলল ‘‘জ্যেঠু, চিরদিন পরতে হবে।’’ বড় আতঙ্কে আছি। এভাবে বাঁচা দায়! তবে একটা উপকার হয়েছে- ঘন ঘন চা খাওয়া বন্ধ। বারবার বন্ধনী খুলে চা খাওয়া নৈব নৈব চ। সুতরাং….। তাই করোনাকে বলতে ইচ্ছে করে কত রঙ্গ দেখালে তুমি- আরও কত দেখাবে!