সিইএসসি গতকাল সন্ধ্যেবেলা (১৯ জুলাই) বিবৃতি জারি করে বলেছে যে, ‘‘বিগত দুই মাসের টাকা যে বর্তমান বিলে অন্তর্ভুক্ত আছে, তা সমস্ত লো-ভোল্টেজ গৃহস্থ্য গ্রাহকদের ক্ষেত্রে আপাতত মুলতুবি রাখা হচ্ছে”। এই বিবৃতি অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর এবং তা বর্ধিত বিল নিয়ে সমস্যার সুরাহার পরিবর্তে আরও বেশি করে ধোঁয়াশার সৃষ্টি করেছে।

সিইএসসি তাদের বিবৃতিতে আরও বলেছে যে, ‘‘গ্রাহকদের এখন শুধুমাত্র বর্তমান মাসে তারা যত টাকার বিদ্যুৎ খরচ করেছেন সেই টাকা দিতে হবে”। কিন্তু সিইএসসি’র পাঠানো সর্বশেষ বিলে বর্তমান মাসে কি পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ করা হয়েছে তার হিসেব দেওয়া নেই।

মে-জুন মাসের যে বিল প্রকৃত মিটার রিডিং-এর ভিত্তিতে পাঠানো হয়েছে সেখানে মোট বিদ্যুৎ খরচের মাসিক হিসেব দেওয়া হয়নি। বরং, যেখানে বর্তমান মিটার রিডিং বিলে লেখা রয়েছে, সেখানে বিগত মিটার রিডিং কত ছিল তা ইচ্ছাকৃতভাবে অনুল্লেখিত রাখা হয়েছে। তাই, বিদ্যুতের কত ইউনিট খরচ হল, তা বাবদ কত টাকা ধার্য করা হল, সেই হিসেবের ভিত্তি রহস্যাবৃত রয়েছে। এই রহস্য আরও বাড়বে যদি গ্রাহকদের বলা হয় শুধুমাত্র বর্তমান মাসের বিদ্যুৎ খরচের টাকা মেটাতে, কারণ বর্তমান মাসে ঠিক কতটা বিদ্যুৎ গ্রাহকেরা খরচ করেছেন তা কেউ জানে না।

আরও পড়ুন: মে-জুন মাসের বিদ্যুৎ বিল সংক্রান্ত সিইএসসি লিমিটেডের ব্যাখ্যা চূড়ান্ত বিভ্রান্তিকর

তদুপরি, গত মাসেই কিছু এলাকার সিইএসসি গ্রাহকেরা ইতিমধ্যেই এহেন রহস্যাবৃত, বিভ্রান্তিকর এবং বর্ধিত বিল পেয়েছেন, এপ্রিল-মে মাসের সাপেক্ষে। অনেকে এই বিলের টাকা মিটিয়েও দিয়েছেন। এখন সিইএসসি কোন পদ্ধতিতে এই গ্রাহকদের বিল সংশোধন করবে? কেন সিইএসসি-র বিদ্যুৎ খরচের হিসেব ঠিক করে না করতে পারার মূল্য গৃহস্থ্য গ্রাহকদের চোকাতে হবে?


CESC Tweet


এখন সিইএসসি’র কী করা উচিত?

১। অবিলম্বে মে-জুন এবং এপ্রিল-মে মাসের বিল গৃহস্থ্য গ্রাহকদের জন্য বাতিল করতে হবে।

২। এই সময়ের জন্য নতুন বিল গ্রাহকদের পাঠাতে হবে যেখানে মিটার রিডিং, মাসিক বিদ্যুৎ খরচ ও তার দাম, স্ল্যাব বেনেফিট এবং সরকারি করের হিসেব স্বচ্ছভাবে গণনা করা আছে।

রাজ্য সরকার এবং পশ্চিমবঙ্গ বিদ্যুৎ নিয়ামক সংস্থার কী করা উচিত?

১। বর্তমানে বিদ্যুৎ ইউনিট খরচের যে স্ল্যাবগুলি আছে তা অচল হয়ে গেছে। ২৫ ইউনিট থেকে প্রথম স্ল্যাব বাতিল করতে হবে এবং প্রথম ২০০ ইউনিট অবধি বিনামূল্যে ভর্তুকিযুক্ত বিদ্যুৎ গৃহস্থ্য গ্রাহকদের ক্ষেত্রে সুনিশ্চিত করতে হবে।

২। কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে সিইএসসি-র একচেটিয়া ব্যবসার অবসান ঘটাতে হবে। এই অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে আরও প্রতিযোগিতা চালু করতে হবে।

উপরোক্ত এই দুটি বিষয় যদি রাজ্য সরকার ও বিদ্যুৎ নিয়ামক সংস্থা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে কোনও রকম পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে এই ধরনের সমস্যা আগামী দিনেও চলতে থাকবে এবং সাধারণ মানুষকে নাস্তানুবাদ হতে হবে।

আরও পড়ুন: রাজ্যে বিদ্যুৎবিলের বেলাগাম বৃদ্ধির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ

সিএসসি’র গতকালের ঘোষণা রাজ্যের ক্ষমতাশীন রাজনৈতিক দলের কাছে হয়তো স্বস্তির কারণ, কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে নয়। এই ঘোষণাটি মানুষকে আরও বিভ্রান্ত করছে বলে আমার মনে হয়। করোনার মতো অতিমারি, আমফানের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সঙ্গে লড়তে লড়তে মানুষ যখন হাপিয়ে উঠেছে তখন সিএসসি’র বিপুল অঙ্কের বিল যেন মরার উপর খাড়ার ঘা। মানুষের ক্ষোভ বাড়ছিল। কলকাতা কর্পোরেশন নির্বাচন, বিধানসভা নির্বাচন যখন দরজায় কড়া নাড়ছে তখন সিইএসসি’র বাড়তি বিল নিয়ে মানুষের ক্ষোভ-বিক্ষোভ রাজ্য তৃণমূল কংগ্রেসের কপালে ভাজ ফেলেছে। তাই রবিবার সন্ধ্যায় সিইএসসি তাদের অফিশিয়াল বিবৃতিটি প্রকাশ করেছে কি করেনি, তা নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ট্যুইট করে দিয়েছেন। ট্যুইটের শেষে তিনি যেভাবে উৎসাহ নিয়ে ‘কলকাতর জয়’ কথাটি লিখেছেন তাতে একটু অবাকই হয়েছি। প্রথমত, সিএসসি নিয়ে তাঁর এই দ্রুত ট্যুইট বার্তাটি প্রকাশের ধরণ দেখে আমার মনে প্রশ্ন জেগেছে উনি কি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী অথবা বিদ্যুৎমন্ত্রী না কি কলকাতার মেয়র? দ্বিতীয়ত, তিনি হয় ইচ্ছাকৃতভাবে না হয় কোনও কিছু না বুঝে সিইএসসি’র চূড়ান্ত বিভ্রান্তিকর এই বিবৃতিটিকে ‘কলকাতার জয়’ হিসেবে দেখাতে চেয়েছেন।