আজ আবার এল সেই ১৩ই আষাঢ়, আজ থেকে ১৮০ বছর আগে ১২৪৫ বঙ্গাব্দের যে  দিনটিতে এক বাঙালি সম্রাটের জন্ম হয়েছিল বঙ্গভূমির স্বজাত্য চেতনাকে জাগ্রত করতে, অভ্যাসে পরিণত দাসত্ব বোধ থেকে এদেশের মানুষকে মুক্ত হবার প্রেরণা যোগাতে, উত্তরণের পথ দেখাতে। তাঁর অস্ত্র ছিল তাঁর মনন ও কলম এবং প্রত্যক্ষভাবে তিনি ছিলেন বাঙালির চেতনাভূমে এক নিরলস যোদ্ধা, সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। পরবর্তীকালে তিনি শুধু বাঙালির থাকেননি, জাতীয় চেতনার পটভূমিতে সার্বিকভাবে হয়ে উঠেছেন সারা ভারতের।
১৮০ বছর আগে জন্মেও বঙ্কিমচন্দ্রের জাতীয়তাবাদী চেতনা ও সাংস্কৃতিক চেতনা কেন আজও এত প্রাসঙ্গিক, কেন এখনও সেই চেতনার তেজস্বীজ্যোতিতে আমরা আলোকিত ও আলোড়িত? এই প্রশ্নটি গভীরভাবে  ভেবে দেখার।
বঙ্কিমচন্দ্র বিশ্বাস করতেন ”সত্য ও ধর্মই সাহিত্যের উদ্দেশ্য। অন্য উদ্দেশ্যে লেখনী ধারণ মহাপাপ।”  তিনি নব্য লেখকদের প্রতি এই স্পষ্ট নির্দেশ প্রদান করেছিলেন, ”যদি মনে এমন বুঝিতে পারেন যে, লিখিয়া দেশের বা মনুষ্যজাতির কিছু মঙ্গল সাধন করিতে পারিবেন অথবা সৌন্দর্য্য সৃষ্টি করিতে পারিবেন, তবে অবশ্যই লিখিবেন। যাঁহারা অন্য উদ্দেশ্যে লেখেন, তাহাদিগকে যাত্রাওয়ালা প্রভৃতি নীচ ব্যবসায়ীদিগের সঙ্গে গণ্য করা যাইতে পারে।”
নিজের সামগ্রিক লেখনীতেও বঙ্কিমচন্দ্র এই ‘সত্য ও ধর্ম’কে তুলে ধরার জন্য সাহসিকতার সঙ্গে সচেষ্ট ছিলেন, যা এখনও বহু সাহিত্য অনুশীলনকারী প্রয়াস করার সাহস করেন না। সেই সময় জাতির ইতিহাসগত সত্যকেই তিনি তাঁর বিভিন্ন লেখার মধ্যে তুলে ধরেছিলেন। মূলত সেই সত্যটি কি ছিল? মূলত আক্রমণকারী বিদেশী শাসকদের হাতে শত শত বৎসর হিন্দু জাতির অসংগঠিত অধীনতা, যা তাঁর হৃদয়কে পীড়া দিত। দীর্ঘদিন বাংলার হিন্দুরা মুসলমান শাসনাধীনে ছিল, পরে এসেছিল ইংরেজ। উভয়েই বিদেশী ও আক্রমণকারী। কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র যখন সাহিত্য রচনা করছেন, সেই সময়টি মোটামুটিভাবে ছিল মুসলমান শাসনের অন্তিমপর্ব এবং ইংরেজ শাসনের সূচনাপর্ব। তাই তাঁর লেখনীতে মুসলিম শাসনকালের প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ হয়েছিল বেশি। ফলে অনেক অবুঝ সমালোচক তাঁকে মুসলমানবিদ্বেষী মনে করে থাকেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি স্বদেশ ও স্বজাতির প্রকৃত অবস্থাটাই তুলে ধরে তাঁর সাহিত্যকর্মে সত্য ও ধর্ম পথের দ্বারা পরিচালিত হয়েছিলেন।
বঙ্কিমচন্দ্রের মুসলিম বিদ্বেষ অভিধা প্রসঙ্গে বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ও দার্শনিক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ যা বলেছিলেন সেটি একবার শুনে নেওয়া যাক। (প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে এই এই দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ ছিলেন প্রবাদপ্রতিম লোকসংগীত গায়ক হাসন রাজার নাতি, তাঁর কন্যার পুত্র।) আজরফ বলেছিলেন “ইসলাম ও মুসলিম মোটেই সমার্থবাচক নয়। কাজেই কোনো ব্যক্তি মুসলিমবিদ্বেষী হলেই তাঁকে ইসলামবিদ্বেষী বলা যায় না।……. বঙ্কিমচন্দ্র বিদেশীয় কোনো মুসলিম চরিত্র সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করেননি। এমনকি সুলতান মামুদের মতো প্রতিমা ধ্বংসকারী সম্বন্ধেও কোনো কটুক্তি করেননি। এতেই স্পষ্ট বোঝা যায়, ভারতের বুকে স্থায়ীভাবে বাস করে, যারা এদেশীয় লোকের স্বাধীনতা হরণ করেছিল, তিনি মুসলমান বলতে তাদেরই মনে করেছিলেন।”
আরও পড়ুন: দাও ফিরিয়ে সেই রবীন্দ্র সদনের ভোর
কোনও কোনও সমালোচক বঙ্কিমচন্দ্র প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে বলেন যে “তিনি ইংরেজদের অধীনে চাকরী করতেন বলেই ভারতের শত্রু হিসাবে তিনি ইংরেজদের বদলে মুসলিমদের বেছে নিয়েছেন। ব্যক্তিগত ভাবে আমি মনে করি, সেটি ছিল বঙ্কিমচন্দ্রের যুদ্ধের একটি কৌশল মাত্র। এক আক্রমণকারী দ্বারা আরেক আক্রমণকারীর প্রতিহতকরণ। একথা অনস্বীকার্য যে, মুসলমান আক্রমণকারী দ্বারা হিন্দুদের যেভাবে নিষ্ঠুরভাবে ধর্মান্তরিত করা হচ্ছিল, সেটি ইংরেজরাই প্রতিহত করেছিল৷ তাই তখন বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর লেখনীতে উল্লেখ করেছিলেন ‘‘ইংরাজ রাজ্যে প্রজা সুখী হইবে-নিষ্কলঙ্ক ধর্মাচরণ করিবেl’’ এখানে প্রজা বলতে যে ভারতীয় হিন্দুগণকে বোঝানো হয়েছে তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু কৌশলগত কারণে ইংরেজের প্রতি নিশ্চুপ থাকলেও বঙ্কিমচন্দ্র চাটুকার ছিলেন না। যদি তাই হতো তাহলে বঙ্কিমচন্দ্র “বন্দে মাতরম্ ” রচনা করতেন না। ভারতজুড়ে তাঁর রচিত এই “বন্দে মাতরম্ ” যে ইংরেজের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল এবং ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকে এক সূত্রে বেঁধে ত্বরান্বিত করেছিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বরং স্বাধীনতার আগে থেকেই কংগ্রেস যে একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের প্রতি তোষণবাজ ছিল, তা ধরা পড়ে গিয়েছিল এই “বন্দে মাতরম্ “কে কেন্দ্র করেই।
Bandemataram Bhavan
‘বন্দে মাতরম্ ভবন’। চুঁচুড়ার জোড়া ঘাটে এই বাড়িতে বসেই ‘বন্দে মাতরম্’ গানটি রচনা করেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র।
একটি বিশেষ সম্প্রদায় বঙ্কিমচন্দ্রের এই “বন্দে মাতরম্ ” গানের মধ্যে পৌত্তলিকতার গন্ধ পেয়ে আপত্তি জানায়। হাস্যকরভাবে দেশকে মা বলতে আপত্তি। আর কারও আপত্তি থাকলেই সেটি মানতে হবে কেন! তাহলে তো বলতে হয়, বাঁকা চাঁদ আর খেঁজুর গাছের প্রতি সম্মান জ্ঞাপনও পৌত্তলিকতা। কিন্তু সেই আপত্তিকেই জাতীয় কংগ্রেস মেনে নিয়েছিল। ১৯৩৭ সনে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে “বন্দে মাতরম্” গানের “ত্বং হি দুর্গা দশপ্রহরধারিণী” অংশটা বাদ দিয়ে দেয়া হয়। ( এটা কি বঙ্কিমচন্দ্রের প্রতি  অসন্মাননা নয় ?) গানটির শুধুমাত্র প্রথমাংশকেই জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে গ্রহণ করা হয়l অথচ ১৮৯৬ সনে কলকাতায় জাতীয় কংগ্রেসের যে অধিবেশন হয়, সেখানে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ যোগদান করে “বন্দে মাতরম্ ” গানটিতে সুরারোপ করে উদাত্ত কণ্ঠে গেয়ে শোনানl আর প্রকৃতপক্ষে সেদিন থেকেই ঋষি বঙ্কিমচন্দ্রের “বন্দে মাতরম্ ” হয়ে উঠেছিল আমাদের জতীয় সঙ্গীতl ক্রমশ “বন্দে মাতরম্ ” হয়ে উঠেছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের চালিকাশক্তি। আর সেই চালিকাশক্তিকেই খণ্ডিত করেছিল ১৯৩৭ সনের কংগ্রেস স্রেফ তোষণবাদকে  প্রশ্রয় দিতে। তোষণ ও দ্বিখণ্ডিতকরণের নীতির সেটাই কি শুরু কংগ্রেসের, যে মানসিকতার  প্রভাব ছিল ভারতবর্ষকে দ্বিখণ্ডিতকরণে?
পরিশেষে আবার ফিরে আসা যাক ১৩ আষাঢ় প্রসঙ্গে। ইদানীং লক্ষ্য করছি ইংরাজি তারিখকে ভিত্তি করেই অনেকে বঙ্কিমচন্দ্রের জন্মদিন পালন করছেন। সেখানেও রয়েছে মতান্তর, কেউ  তাঁর  জন্মদিন পালন করছেন  ২৬ শে জুন আবার কেউ বা  ২৭ শে জুনl আসলে ১৮৩৮ খৃষ্টাব্দের ২৬ জুন যেদিন বঙ্কিমচন্দ্র জন্মগ্রহণ করেছিলেন সেদিন বঙ্গাব্দ অনুযায়ী ছিল ১২৪৫ এর ১৩ আষাঢ়। প্রতিবছর ইংরেজি ও  বাংলা তারিখ একভাবে মেলে না। এবছর যেমন ১৩ আষাঢ় আজ ২৮ শে জুন পড়েছেl ঠিক যেমন  রবীন্দ্রনাথ যে বছর পঁচিশে বৈশাখে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, ইংরাজি তারিখ মতে সেই দিনটি ছিল ৭ই  মে।  প্রতি বছর ৭ই মে’ আর ২৫ শে বৈশাখ এক হয় নাl এবার যেমন ৯ই মে ‘ ছিল ২৫ শে বৈশাখ। কিন্তু যেহেতু বাংলা ভাষার কবিগুরু, বাঙালির রবীন্দ্রনাথের জন্ম জয়ন্তী পালনে আমরা বাংলা তারিখ মতে ২৫ শে বৈশাখে স্থিত  রয়েছি, রবীন্দ্রজয়ন্তী পালনে আমাদের কোনও মতান্তর নেই, দ্বিধা বিভক্তি নেই। আমাদের কাছে ২৫ শে বৈশাখ মানেই রবীন্দ্রনাথ। ঠিক তেমনই বাঙালির ইতিহাস ও সংস্কৃতিগত চেতনার উন্মেষ ঘটাতে যে বাঙালি বঙ্কিমচন্দ্র বাংলায় তাঁর সৃজন সাধনা করে গেলেন, তাঁর জন্মদিন পালনে কেন আমরা সর্বজনীনভাবে ১৩ আষাঢ়ে স্থিত হতে পারি না?