বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সদ্যপ্রয়াত মোহিত ভট্টাচার্য তাঁর বহুপঠিত গ্রন্থ Public Administration – এ জনপ্রশাসনের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছিলেন ‘Public administration is the action part of the government’. অর্থাৎ সরকারের কাজ করার অংশটি হল জনপ্রশাসন।  একটি প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রে জনগণ তার পছন্দের রাজনৈতিক দলকে নির্বাচিত করে ভোটের মাধ্যমে। আর সুনির্দিষ্ট সময়ের জন্য সেই দল বা দলগুলির কোনও জোট সরকার পরিচালনা করে। সেই সরকারের কার্যকলাপের মূল্যায়ন হয় পরবর্তী নির্বাচনের সময়। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হলে তারা আবার এই সরকারকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনে। অপছন্দ হলে সরিয়ে দেয় ক্ষমতা থেকে। নতুন কোনও দল বা জোট আসে তাদের নতুন ভাবনা, নতুন কর্মসূচী নিয়ে। এটাই গণতন্ত্রের নিয়ম।

তবে দুটি নির্বাচনের মধ্যবর্তী সময়ে জনগণের দায়িত্ব বা ভূমিকা শেষ হয়ে যায় না। সরকারের কাজকর্ম বা সিদ্ধান্ত জনগণের পছন্দ না হলে বিতর্ক তৈরি হয়। মানুষ প্রতিবাদ করে। জীবন দুর্বিষহ হলে প্রতিবাদ করে। পথে নামে। পশ্চিমের উন্নত গণতন্ত্রে জনগণের প্রতিবাদ দেখলেই সরকার নিজেকে সংযত করে নেয়। সবসময় মানুষকে পথে নামতে হয় না। মানুষ প্রবল ক্ষোভ নিয়ে পথে নামলে সরকারের গদিই টলে যায়।

আমাদের দেশ উন্নত গণতন্ত্রের দেশ। তৃতীয় বিশ্বের তকমা ঝেড়ে ফেলে আমরা অতি দ্রুত প্রথম বিশ্ব হয়ে ওঠার প্রচেষ্টায় ব্যাপৃত আছি। কিন্তু এখনও যে বৈশিষ্ট্যগুলোকে ঝেড়ে ফেলতে পারিনি তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল সরকার ও জনগণের মধ্যে সম্পর্ক। পশ্চিমের উন্নত গণতন্ত্রে এই সম্পর্কটা একেবারে সরাসরি। আমাদের মতো দেশে এই সম্পর্কের মাঝখানে থাকে অন্য একটি গোষ্ঠী। সেটি হল রাজনৈতিক দল। আমাদের জনপ্রিয় রাজনৈতিক পরিভাষায় ‘পার্টি’। সরকারের সাথে জনসাধারণের সম্পর্কের প্রকৃতিকে অনেকটা তারাই নির্ধারণ করে দেয়। সরকারের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ সংগঠিত করা যেমন আমাদের মতো দেশে সরকারবিরোধী  রাজনৈতিক দলগুলিই সংগঠিত করে, সরকারের পক্ষে যাতে সমর্থন থাকে সে দায়িত্বও নেয় সরকার পক্ষের দলগুলো। অর্থাৎ পশ্চিমী গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর সক্রিয়তা যেখানে অনুভূত হয় মূলত নির্বাচনের সময়, আমাদের মতো দেশে তাদের উপস্থিতি ৩৬৫ দিন। ফলে আমাদের দেশে সরকার ও জনগণের সম্পর্ক আলোচনা করলে তার মধ্যে ‘পার্টি’ আসবেই। বিশেষত পশ্চিমবাংলার রাজনৈতিক ব্যবস্থায় যেখানে সমাজে এবং মানুষের জীবনে পার্টির অস্তিত্ব কেবল ৩৬৫ দিন নয়, দিনের প্রতিটি ঘণ্টা।

পার্টি, প্রশাসন ও জনগণের সম্পর্ক গোটা ভারতের রাজনৈতিক ব্যবস্থাতেই এক জটিলতার গোলকধাঁধায় ঘুরপাক খায়। কারণ দীর্ঘ দুশো বছরের সাম্রাজ্যবাদী শাসনে প্রশাসনের কাজই ছিল ঔপনিবেশিক প্রভুদের হুকুম তামিল করা। স্বাধীনোত্তর সময়কালের  প্রথম ২৫ বছর এ দেশে প্রশাসনের তুলনামূলক নিরপেক্ষতা বজায় ছিল কারণ, প্রশাসনের কাজে দলীয় হস্তক্ষেপ তখন ছিল ব্যতিক্রম, নিয়ম নয়।  ১৯৭২ সালে ক্ষমতায় আসার পরেই প্রশাসন নিয়ে এবং প্রশাসন ও দলের সম্পর্ক নিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর মনোভাব বদলাতে থাকে। ইন্দিরা গান্ধীর মস্তিস্কপ্রসূত দায়বদ্ধ আমলাতন্ত্রের মূল নির্যাস ছিল, প্রশাসন তার তথাকথিত নিরপেক্ষতার দৃষ্টিকোণ দিয়ে নয়, দায়বদ্ধতার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সরকারের উন্নয়নকার্যে সামিল হবে।  বাস্তবে ইন্দিরার প্রধান লক্ষ্যই ছিল জনপ্রশাসনকে তার নিরপেক্ষতার ঘেরাটোপ থেকে বার করে এনে তাকে ক্ষমতাসীন দলের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা। ভারতে প্রশাসনিক সংস্কৃতির যে বদল ইন্দিরা গান্ধী ঘটিয়েছিলেন ভারতীয় প্রশাসন তার হাত থেকে পুরোপুরি মুক্তি পেয়েছে সে কথা বলা যায় না। তবে মুক্তির প্রচেষ্টা চলছে, এখনও সেই চেষ্টা বিদ্যমান।  আর গোটা ভারতের ক্ষেত্রে ইন্দিরা গান্ধী যে সংস্কৃতির প্রবর্তন ঘটিয়েছিলেন, পশ্চিমবাংলা তাকে একেবারে আত্মস্থ করেছে। এখানে প্রশাসনকে দলীয় রাজনীতির প্রভাবমুক্ত করা তো দূরের কথা, গত ৪৩ বছরে প্রশাসনকে কতখানি দলের প্রভাবাধীনে আনা যায় সেই চেষ্টাই চলছে।  চলছে বিরতিহীনভাবে।

বাংলার ক্ষেত্রে সমস্যাটা অনেক জটিল কারণ, এখানে সমাজের সর্বস্তরে পার্টির উপস্থিতি এবং সক্রিয় ভূমিকা দেখা যায়।  এক্ষেত্রেও বাম দলগুলির দায় এবং দায়িত্ব অনেক বেশী। বামেরা সমাজের স্বাভাবিক বিকাশের ধারণায় বিশ্বাস রাখে না। তারা মনে করে সমাজের বিকাশ ঘটবে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে। দল বা পার্টি এই নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করবে। পশ্চিমবাংলায় তাদের সাড়ে তিন দশকের শাসনে বামেরা এই মডেলটাকেই বাস্তবে প্রয়োগ করেছিল। রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বক্ষেত্রে এরাজ্যে পার্টির উপস্থিতি ছিল এক অমোঘ সত্যের মতো। পার্টি কেবল সরকার এবং জনগণের মধ্যে সংযোগসাধনের কাজ করতো না, রাজনীতির আওতার বাইরেও বিভিন্ন সামাজিক ক্ষেত্রে পার্টির উপস্থিতি সক্রিয় ভূমিকা ছিল এবং মানুষকে তা মেনে নিতে হত।

Bengal Politics

১৯৭৮ সালে পশ্চিমবাংলায় স্থানীয় সরকার (পঞ্চায়েত ও পুরসভা) চালু হওয়ার পর সমাজে পার্টির সক্রিয় ভূমিকা আরও বেড়ে যায়। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, ১৯৬৭ এবং ১৯৬৯ এই দু’বছর দু’বার অল্প সময়ের জন্য কমিউনিস্ট দলগুলো পশ্চিমবাংলায় রাজ্য সরকার পরিচালনা করেছিল অন্য বেশ কিছু দলকে নিয়ে, যাদের মধ্যে বাম অবাম সকলেই ছিল। অল্প সময়ের জন্য হলেও সমাজের সর্বত্র দলীয় রাজনীতি অনুপ্রবেশ ঘটানোর যে কাজ প্রধান বামদল সিপিএম করেছিল তার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব বাংলার রাজনীতিতে পড়েছিল। সিপিএম-এর ভূমিকার প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন বলে ১৯৭৮ সালে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র সেন দলহীন গণতন্ত্রের মডেলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দাবি তুলেছিলেন। কিন্তু শাসকদল সিপিএম ও তার সহযোগী বামদলগুলো তাতে কর্ণপাত করেনি। চালু হয়েছিল দলভিত্তিক স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থা। বাংলার সমাজ ও রাজনীতিতে এর ফল ভালো হয় নি।

২০০৬-২০০৭ সময়ে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের ঘটনার পর মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ গোটা বাংলার প্রতিটি কোণায় আছড়ে পড়েছিল। এখনও সেই অবস্থা দেখা না দিলেও মানুষ যেভাবে প্রতিবাদে সামিল হচ্ছে তাতে শাসকদলের চিন্তার কারণ আছে। মানুষের অসন্তোষ ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে প্রতিফলিত হয়েছে। ২০২১ কিন্তু আর খুব দূরে নয়।

স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলের অনুপ্রবেশের কারণে ১৯৭৮ পরবর্তী সময়ে বাংলার রাজনীতিতে রাজনৈতিক দলগুলি এক নতুন ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। দলের নেতারা সাধারণ মানুষের সাথে গড়ে তোলে দাতা-গ্রহীতার সম্পর্ক। কেউ কেউ এই সম্পর্ককে পেট্রন-ক্লায়েন্ট সম্পর্ক বলেও চিহ্নিত করেছেন। স্থানীয় সরকারের বকলমে পার্টির নেতারাই হয়ে ওঠেন ‘দাতা’ আর সাধারণ মানুষ হয়ে ওঠে ‘গ্রহীতা’। পশ্চিমবাংলার অর্থনৈতিক উন্নতি যত কমতে থাকে গ্রহীতার সংখ্যাও ততই বাড়ে। দাতাদের শক্তি ও প্রভাব সেই অনুপাতে বেড়ে চলে।  স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে যে কোনও উপায়ে নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রবণতাও বাড়তে থাকে। কারণ, নয়া সুবিধাভোগী শ্রেণী ক্ষমতার বৃত্তের বাইরে যেতে চাইছিল না। তাই ১৯৭৩ সালের পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চায়েত আইন অনুযায়ী প্রথম নির্বাচন হয়েছিল ১৯৭৮ সালে এবং এই নির্বাচনে হিংসা প্রায় ছিলই না। হিংসার প্রকোপ বৃদ্ধি পায় ১৯৮৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচন থেকেই। তারপর থেকে যত পঞ্চায়েত ও পুরসভার নির্বাচন হয়েছে কোনও নির্বাচনই হিংসামুক্ত থাকেনি। যেকোনও উপায়ে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রবণতা দেখা যায় কারণ, এর দ্বারা স্থানীয় রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। এছাড়া স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলির মাধ্যমে উন্নয়নের কাজ যত বেশী চলতে থাকে ততই গড়ে ওঠে একদল সুবিধাভোগী শ্রেণী যাদের অনেকের বৈষয়িক উন্নতি ছিল চোখে পড়ার মতো। একশ্রেণীর মানুষের দুর্নীতি জনমানসে এতটাই প্রভাব ফেলেছিল যে মানুষের কাছে যখন কোনও বিকল্প ভাবমূর্তি এসেছে মানুষ তাকেই গ্রহণ করেছে। এই কারণেই তৃণমূল নেত্রীর সাধাসিধে জীবনযাপন এবং সৎ ভাবমূর্তি সিপিএম-এর বিরুদ্ধে লড়াইতে এতটা কার্যকরী অস্ত্র ছিল। সমাজে অসততা ছিল বলেই সৎ ভাবমূর্তি এভাবে মানুষের মন জয় করেছিল। এখানে আরও একটি বিষয় মনে রাখতে হবে। বাম দলগুলির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারাও অপেক্ষাকৃত পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির অধিকারী ছিলেন। কিন্তু তা স্বত্ত্বেও তারা স্থানীয় স্তরে দুর্নীতি দমনে কার্যকর ভূমিকা নিলেন না কেন?  এর উত্তর একটাই। দীর্ঘদিন ক্ষমতা ভোগ করার পর তাঁদের ভাবনাচিন্তাও ক্ষমতার বৃত্তের বাইরে যেতে পারেনি। ক্ষমতার স্বার্থে দুর্নীতির সাথে আপস করতেও তারা পিছপা ছিলেন না। ফলে পার্টির স্থানীয় নেতৃত্ব হয়ে উঠেছিল আরও বেপরোয়া। ধসে যাচ্ছিল পার্টির ভিত। ফলে ক্ষমতা হারানোর অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই সিপিএম-এর মতো অতি শক্তিশালী বাম দলও বাংলার রাজনীতিতে এক প্রান্তিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। অন্য বামেদের অতি শক্তিশালী দূরবীন দিয়েও খুঁজে পাওয়া কঠিন।

পশ্চিমবাংলার বর্তমান শাসকগোষ্ঠীকে নিয়ে যে বিতর্ক এখন সমাজের সর্বত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে তাকে এই প্রেক্ষাপটেই বিচার করতে হবে। ২০১১ সালে মানুষ সিপিএমকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়েছিল কারণ মানুষ এক শ্বাসরোধকারী অবস্থা থেকে মুক্তি চাইছিল। সিপিএমকে মানুষ কতটা অপছন্দ করত এটা বোঝা যায় ক্ষমতাসীন সরকারের মুখ্যমন্ত্রীর নির্বাচনে পরাজয় দেখে। যেহেতু তৃণমূল কংগ্রেস সিপিএম-এর মতো সংগঠিত দল নয় ফলে বাংলায় কোনও লৌহমুষ্টির শাসন থাকবে না এটাই ছিল একটা বড় অংশের মানুষের আশা। কিন্তু বিগত নয় বছরের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে বর্তমান শাসক দলের শিথিল সংগঠন কেবল ক্ষমতাসীন দল তথা সরকারের ক্ষতি করেনি,  সমাজের উপরও এক বিরূপ প্রভাব ফেলছে। শিথিল সংগঠনে নিয়ন্ত্রণ থাকে না। ফলে বেপরোয়া দুর্নীতিবাজরা সহজেই আখের গোছায়। ২০১৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে এরাজ্যে যতটা হিংসা হয়েছিল তার বহুগুণ হিংসা হয়েছে ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে। এককথায় ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে এক নজিরবিহীন হিংসার সাক্ষী হয় পশ্চিমবাংলার মানুষ। বাম আমলে যে কারণে স্থানীয় প্রতিষ্ঠান সমেত বিভিন্ন নির্বাচনে হিংসা হত, এখনও হিংসার কারণগুলি প্রায় একই। স্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতে থাকলে মানুষের সাথে দাতা-গ্রহীতার সম্পর্ক থাকে। আর যারা দাতার ভূমিকায় আছে তারা কিছুতেই সুবিধার সেই অবস্থান ছাড়তে চায় না। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বাইরে পশ্চিমবাংলার সমাজকে বার করা সম্ভব হয়নি। বরং দুর্নীতি ক্রমেই মজ্জাগত হচ্ছে। বাংলার সমাজ ও রাজনীতি ক্রমেই তলিয়ে যাচ্ছে গভীর সমস্যার অতলে।

তবে আশার রুপোলী রেখা এখন আবার দৃশ্যমান হচ্ছে। করোনা অতিমারী এবং তারপর সুপার সাইক্লোন আমফানের ধ্বংসলীলার পর ত্রাণে দুর্নীতির বিরুদ্ধে মানুষ ক্রমেই প্রতিবাদ করছে। শাসক দলকে ভয় পাওয়ার যে খারাপ ঐতিহ্য পশ্চিমবাংলার সমাজে গত চার দশক ধরেই আছে, মানুষ তাকে জয় করে প্রতিবাদে সামিল হচ্ছে। ২০০৬-২০০৭ সময়ে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের ঘটনার পর মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ গোটা বাংলার প্রতিটি কোণায় আছড়ে পড়েছিল। এখনও সেই অবস্থা দেখা না দিলেও মানুষ যেভাবে প্রতিবাদে সামিল হচ্ছে তাতে শাসকদলের চিন্তার কারণ আছে। মানুষের অসন্তোষ ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে প্রতিফলিত হয়েছে। ২০২১ কিন্তু আর খুব দূরে নয়।

রাজনীতির চর্চাকারীদের মনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল শাসকদল কি এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে?  শাসকদলের নেতৃত্ব মেনে নিয়েছেন দুর্নীতি হয়েছে। মানুষকে সুবিধে পৌঁছে দেওয়ার নামে কাটমানি নেওয়া হয়েছে। কাটমানি ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। কোথাও কোথাও ফেরত দেওয়ার খবরও সংবাদমাধ্যমে এসেছে।

কিন্ত দুর্নীতি আর স্বজনপোষণ যে দূর করা যায়নি তার প্রমাণ আমফান ত্রাণে ব্যাপক দলবাজি আর স্বজনপোষণ। এখন আবার টাকা ফেরত দেওয়ার খবর আসছে সংবাদমাধ্যমে নিয়মিতভাবে। কিন্তু টাকা ফেরত দিয়ে ক্ষমা চেয়ে নিলেই কি মানুষ সব ভুলে যায়?  ক্ষমা করে দেয়?  ইতিহাস কিন্তু তা বলে না। সিপিএম-এর রাজত্বের শেষের দিকে সিপিএমও তার দলের সদস্যদের বলেছিল মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভুলের জন্য ক্ষমা চাইতে। মানুষ ক্ষমা করেনি। ১৯৯৯ সালে উড়িশার সুপার সাইক্লোন ( তখন ঘটা করে নাম দেওয়ার চল ছিল না) ওই রাজ্যের উপকূলবর্তী অঞ্চলের বিস্তীর্ণ অংশকে একেবারে ধ্বংস করে দিয়েছিল। তৎকালীন কংগ্রেস সরকার ত্রাণ ও পুনর্বাসনে একেবারে ব্যর্থ হয়েছিল। পরের নির্বাচনে কংগ্রেস হেরে যায়। আর কোনওদিন কংগ্রেস ওই রাজ্যে ক্ষমতায় ফিরতে পারেনি। এখন ওড়িশার রাজনীতিতে কংগ্রেস একটি প্রান্তিক শক্তি। ক্ষমা চাইলেই মানুষ ক্ষমা করে দেবে রাজনীতি এত সহজ পথে চলে না।