‘‘সবাই দেখছে যে, রাজা উলঙ্গ, তবুও
সবাই হাততালি দিচ্ছে।
সবাই চেঁচিয়ে বলছে; শাবাশ, শাবাশ!
কারও মনে সংস্কার, কারও ভয়;
কেউ-বা নিজের বুদ্ধি অন্য মানুষের কাছে বন্ধক দিয়েছে;
কেউ-বা পরান্নভোজী, কেউ
কৃপাপ্রার্থী, উমেদার, প্রবঞ্চক;
কেউ ভাবছে, রাজবস্ত্র সত্যিই অতীব সূক্ষ্ম , চোখে
পড়ছে না যদিও, তবু আছে,
অন্তত থাকাটা কিছু অসম্ভব নয়।
…..। ’’
ডা: অরুণাচল দত্তচৌধুরী, রাজ্যের প্রায় সকলেই এখন এই নামের সঙ্গে পরিচিত হয়ে গিয়েছেন। কারণ, একজন সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক হিসাবে তিনি ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে লেখালেখি করেছিলেন। কড়া ভাষায় আমাদের রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবার বেহাল দশা নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন। তাই তাকে রাজ্য সরকার সাসপেন্ড করেছে সরকারি ‘নিয়ম শৃঙ্খলা’ না মানার জন্য। এই ওয়েবসাইটে অর্থাৎ bitarka.com-এ তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়েছিল।
অরুণাচলবাবুর সাসপেন্ডের খবর প্রকাশিত হওয়ার পর, একটি বড় অংশের মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, আবার অনেকে বলছেন- অরুণাচলবাবু সঠিক কাজ করেছেন। আবার অনেকে বলছেন, অরুণাচলবাবু একটি সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক হিসাবে সঠিক কাজ করেননি। যখন স্বাস্থ্য দফতর একটি ‘কঠিন পরিস্থিতি’র মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, তখন এসব ‘বিতর্কিত’ লেখালেখি করা ওনার উচিত হয়নি। উনি সরকারি কর্মী হিসেবে নিজের ‘এথিক্স’ মানেননি। আবার অনেকেই বলেছেন, হাসপাতালে যখন এত রোগীর চাপ তখন তিনি লেখালেখির সময় পেলেন কি করে?
এবার বলি, অরুণাচলবাবু বারাসাত জেলা হাসপাতালের চিকিৎসক। নিয়মিত কবিতা লেখেন, বিভিন্ন সামাজিক বিষয় নিয়ে লেখালেখি করেন। যে লেখাটি নিয়ে এত সমস্যা, সেই লেখাটিতে অরুণাচলবাবু রাজ্যে ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবার কি হাল তার একটি চিত্র তুলে ধরেছিলেন। হ্যাঁ, ধরে নিলাম সরকারি জায়গায় কাজ করলে সরকারের মতো করেই আপনাকে মতপ্রকাশ করতে হবে। সরকারি কর্মীর আবার বাক স্বাধীনতা কিসের!  সরকারি কোষাগার থেকে বেতন নেবেন আবার তার সমালোচনা করবেন, ন্যূনতম ‘এথিক্স’ বলে কিছু নেই!
আরও পড়ুন: ‘অজানা জ্বর’ ও এক সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকের অভিজ্ঞতা
এ’সবই না হয় ঠিক আছে, কিন্তু তা বলে কি সত্যিটা কখনও মিথ্যা হয়ে যায়। অর্থাৎ অরুণাচলবাবু যে বিষয়গুলি তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলেন সেগুলো কি মিথ্যা হয়ে যাবে?
সপ্তাহ দু’য়েক আগে রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারি হাসপাতালগুলির কি অবস্থা নিজের চোখে দেখতে গিয়েছিলাম বারাসাত জেলা হাসপাতালে। যেহেতু উত্তর ২৪ পরগনা জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বেশি, তাই বারাসাত হাসপাতালে গিয়েছিলাম। সকাল সাতটা থেকে গোটা একটা দিন হাসপাতালে ঘুরে ঘুরে দেখেছি কি ভয়ঙ্কর অবস্থা। জ্বর গায়ে নিয়ে মুহুর্মুহ হাসপাতালের গেট দিয়ে রোগী ঢুকছে। হাসপাতালের ভিতরে কার্যত পা ফেলার জায়গা নেই। সর্বদা আতঙ্ক কাজ করছিল, এই বুঝি মেঝেতে শুয়ে থাকা কোনও রোগীকে পাড়িয়ে দিলাম।
হাসপাতাল কানায় কানায় ভর্তি। কার্যত একজন রোগীর গায়ের উপর আরেকজন রোগী। মেডিসিন ওয়ার্ডে কোনও কোনও বেডে দু’জন শোয়া অবস্থায় এবং তিনজন রোগী কোনওমতে স্যালাইনের বোতল হাতে নিয়ে বসে রয়েছেন। মেঝেগুলিও রোগীতে ভরা, হাসপাতালের করিডোর থেকে সিড়ির ল্যান্ডিং, বাথরুমের দরজার বাইরে সার দিয়ে রোগী শুয়ে, বসে রয়েছে। হাসপাতালে বেশ কয়েকটি অতিরিক্ত ঘর খুলে দেওয়া হয়েছে। সেখানেও মেঝে ফাঁকা নেই। একটা দৃশ্যের কথা উল্লেখ না করে পারছি না- মেল, ফিমেল ওয়ার্ডের বাইরে বেরিয়ে টানা করিডর, তার এক প্রান্তে চার-পাঁচ জন রোগী গায়ে গা লাগিয়ে শুয়ে, বসে রয়েছেন (মনে হচ্ছে যেন মানুষের স্তুপ)। মাঝখানে একটা স্ট্যান্ডে চারটে স্যালাইনের বোতল ঝোলানো রয়েছে, তা থেকে চ্যানেলের মাধ্যমে চার জন রোগীর শরীরে ‘ফ্লুইড’ যাচ্ছে। সিড়ি দিয়ে নেমে আউটডোরের সামনে দিয়ে বাইরে বেরোনোর কয়েক পা পথ যেতে সময় লাগল দশ মিনিটেরও বেশী। রোগীদের ভিড় ঠেলে বেরিয়ে রীতিমতো ঘাম মুছতে হল। হাসপাতেলের প্রায় ৯৫ শতাংশ রোগীই গায়ে জ্বর নিয়ে ভর্তি হয়েছেন।
এত গেল রোগীদের চাপের কথা। এবার চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীদের কথায় আসি। দু’জন সিনিয়র চিকিৎসক এবং তিন জন জুনিয়র চিকিৎসককে দেখলাম রীতিমতো হাঁপাচ্ছেন। তাঁরা রোগীকে একবার ছুঁয়ে দেখলেই সেই রোগী যেন ধন্য হয়ে যাচ্ছে। কারণ, সব রোগীর কাছে চিকিৎসকের পৌঁছনো সম্ভব হচ্ছে না। আর সিনিয়র নার্স স্টাফরা পেপার ওয়ার্ক ও স্যালাইনের বোতল দিতে দিতেই ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলেন। হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলিতে দেখলাম বেশ কয়েকজন তরুণ-তরুণীকে ছোটাছুটি করে বেড়াতে। জানলাম এরা কেউ এসেছে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মিশনের কর্মী হিসেবে অথবা কেউ এসেছেন সেন্ট জন অ্যাম্বুলেন্স বা রেড ক্রসের কোর্স করা অবস্থায় ট্রেনিংয়ের জন্য। এদের অনেকেরই বেতন নেই, কেবল ভবিষ্যৎয়ে ‘ভাল’ সার্টিফিকেটের আশায় অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন। বলতে দ্বিধা নেই এরা না থাকলে কতজন রোগীকে স্যালাইন দেওয়া যেত সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
যে বিষয়টি নজরে এড়াল না সেটি হল, হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স, কর্মীরা সকলেই আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন, কারণ জ্বর নিয়ে আসা রোগীদের কোনওমতেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত বলা যাবে না, ‘উপর’ থেকে নাকি নির্দেশ এসেছে। ফলে কীভাবে রোগীদের কেসস্টাডি লেখা হবে তা নিয়ে চিকিৎসক এবং নার্সরা নিজেদের মধ্যে ফিসফাস করে আলোচনা করে নিচ্ছেন। প্লেটলেটের কাউন্টিং নিয়ে রোগী বা তার বাড়ির লোকদের কিছু বলা যাবে না।
গোটা একদিনে যা অভিজ্ঞতা হল সেটি সংক্ষেপে লিখে শেষ করা সম্ভব নয়। তবে ওই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আমার মনে হচ্ছিল, স্বাধীনতার সত্তর বছর পরও আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার এ কী হাল? ন্যূনতম স্বাস্থ্য পরিষেবাটুকুও মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যাচ্ছে না! মনে হচ্ছিল বড় কোনও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর কোনও হাসপাতালে এসেছি আর্ত মানুষদের দেখতে (যদিও আমাদের রাজ্য সরকার ডেঙ্গুকে একরকম প্রাকৃতিক বিপর্যয়ই বলছে! )।
এই হাসপাতালে যে মানুষগুলো চিকিৎসার আশা নিয়ে আসছিলেন তাঁদের অধিকাংশই দেগঙ্গা, বাদুরিয়া ও সংলগ্ন এলাকা থেকে আসছিলেন। তাঁদের অধিকাংশই আবার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। আর কিছু দিনের মধ্যেই পঞ্চায়েত নির্বাচন। রাজনৈতিক কর্মীরা ভোট ভিক্ষা করতে তাদের দরজায় হাজির হবে, তখন তারা কি বলবেন, যে রাজ্যে সরকার আমাদের রোগ ও পরিজনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বলতে দ্বিধা করে সেখানে আমাদের ভোট দিয়ে কী লাভ?
যাক সরকারি ‘সিস্টেম’এর মধ্যে থেকেও, স্তাবকদের ভিড়ের মধ্যে থেকেও অরুণাচলবাবু অন্তত ‘উলঙ্গ রাজা’কে জিজ্ঞাসা করার সাহস দেখিয়েছেন- ‘‘রাজা তোর কাপড় কোথায়?’’