সাধারণত সন্ধিক্ষণ শব্দটি ব্যবহার করা হয় সেই অবস্থাকে বোঝাতে যেখানে সমাজ ও রাজনীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের বাঁকে দাঁড়িয়ে থাকে। ২০২১ সালের বিধানসভা  নির্বাচনে পশ্চিম বাংলার সমাজ ও রাজনীতির কোনও পরিবর্তন হবে কি না সেই প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যৎ দেবে। তবে এ রাজ্যের সমাজ ও রাজনীতিতে যে পরিবর্তনের বিপুল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে তা বাংলার বর্তমান গতিপ্রকৃতি দেখলে অবশ্যই অনুধাবন করা যায়। সমাজ ও রাজনীতি পরস্পরের উপর নির্ভরশীল। একটির পরিবর্তন ঘটলে অপরটির উপর তার প্রভাব পড়তে বাধ্য। রাজনীতির ক্ষেত্রটিতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটলে বৃহত্তর সমাজের উপর তার প্রভাবও পড়ে। কারণ, রাজনৈতিক দলগুলি কেবল প্রশাসন পরিচালনা করেই ক্ষান্ত থাকে না, সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও তাদের উপস্থিতি অনুভূত হয়। ফলে কোনও রাজনৈতিক দলের কার্যকলাপ বৃহত্তর সমাজকে প্রভাবিত করে। বাংলার মতো একটি অতি রাজনীতিকৃত রাজ্যে এটা বেশী করে ঘটে। বিগত শতাব্দীর ৭০-এর দশক থেকে বাম দলগুলো এ’রাজ্যে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করার পর থেকে এটা আরও বেশী করে ঘটে চলেছে।

১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত এই ২০ বছর এ’রাজ্যে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল ভারতের জাতীয় কংগ্রেস। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তি কংগ্রেস স্বাধীনতার পর দীর্ঘ দু’দশক রাজ্যের শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করেছে ঠিকই কিন্তু সমাজের সর্বক্ষেত্রে অনুপ্রবেশ করার কাজ কখনও করেনি, তার প্রয়োজনও হয়নি। কারণ, কংগ্রেস একটি রাজনৈতিক দল হলেও স্বাধীনতার পর প্রথম কয়েক দশক এক সামাজিক শক্তি হিসেবেও তার অস্তিত্ব বজায় রেখেছিল। ভারতীয় সমাজ ও রাজনীতির উপর কংগ্রেসের এই অপ্রতিহত প্রভাব দেখেই বিশিষ্ট রাজনীতি বিজ্ঞানী  রজনী কোঠারি স্বাধীন ভারতের প্রথম কয়েক দশককে ‘ কংগ্রেস সিস্টেম ‘ বলে উল্লেখ করেন।

১৯৪৭ সালের ৪ জুলাই শপথ নিয়েছিল  প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষের নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস মন্ত্রিসভা। যদিও দেশভাগজনিত অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে এক কঠোর নেতৃত্বের প্রয়োজন ছিল বলে ১৯৪৮ সালের ১৪ই জানুয়ারী প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষকে সরিয়ে বিধান চন্দ্র রায়ের নেতৃত্বে গঠিত হয় কংগ্রেস মন্ত্রিসভা। এরপর ১৯৬২ সালের ১ জুলাই বিধান চন্দ্র রায়ের মৃত্যু পর্যন্ত বাংলার রাজনীতি কখনোই সেভাবে অস্থিতিশীল হয়নি। কারণ, একদিকে বিধান চন্দ্র রায়ের সুদক্ষ প্রশাসনিক নেতৃত্ব অন্যদিকে অতুল্য ঘোষের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বাংলার রাজনীতিকে স্থিতাবস্থার মধ্যেই রেখেছিল। কিন্তু ১৯৬২ সালে বিধান চন্দ্র রায়ের মৃত্যু, তাঁর শূন্যস্থান পূরণে কংগ্রেস নেতৃত্বের ব্যর্থতা এবং কংগ্রেসের আভ্যন্তরীণ সংকট, দলাদলি ও দুর্নীতি ১৯৬৭ সালের নির্বাচনে কংগ্রেসকে বিপর্যস্ত করে দেয়। যে কংগ্রেস ১৯৬২ সালের নির্বাচনে ২৮০টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ১৫৭ টিতে জয়লাভ করেছিল, ভোট পেয়েছিল ৪৭.২৯ শতাংশ, সেই দল ১৯৬৭ সালের নির্বাচনে ১২৭ টি আসন এবং ৪১.১৪ শতাংশ ভোট পায়। মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল চন্দ্র সেন নিজে আরামবাগ কেন্দ্র থেকে পরাজিত হন। মাত্র ১৪ টি আসন বেশী পেলে কংগ্রেস সরকার গঠন করতে পারত। কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে গিয়ে বাংলা কংগ্রেস গঠন করা ( যা কংগ্রেসের পরাজয়ের একটা বড় কারণ ছিল) অজয় মুখোপাধ্যায়ের সাথে বিবাদ মিটিয়ে তাঁকে দলে ফেরালেও কংগ্রেস আবার পশ্চিম বাংলায় ক্ষমতায় আসতে পারত। কিন্তু তৎকালীন রাজ্য কংগ্রেসের নেতৃত্ব পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পারেননি। আর কংগ্রেসকে ক্ষমতার বাইরে রাখতে কৃতসংকল্প বিরোধী দলগুলি বিশেষত সিপিএমের মতো বামদল  এই পরিস্থিতির পূর্ণ সুযোগ নিয়েছিল। বাংলার রাজনীতিতে প্রথম একটি অকংগ্রেসী জোট সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যুক্তফ্রন্ট নামে।

১৯৬৭ থেকে ১৯৭২ এই পাঁচ বছর পশ্চিম বাংলার রাজনীতি প্রায় এক অন্ধকারময় যুগে প্রবেশ করেছিল হিংসা এবং অস্থিতিশীলতার কারণে। এর গভীর প্রভাব পরবর্তীকালে রাজনীতির উপরও পড়েছিল। হিংসা এবং রাজনৈতিক অসহনশীলতার হাত থেকে বাংলা এখনও মুক্তি পায়নি।

সুতরাং বাংলার রাজনীতিতে ১৯৬৭ সালকে একটি সন্ধিক্ষণ বলা যেতে পারে। ১৯৬৭ সালেই এ’রাজ্যে প্রথম একটি অকংগ্রেসী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এই জোট সরকারের মূল চালিকাশক্তি ছিল সিপিআই(এম)। যারা মতাদর্শ, কর্মসূচি সব দিক দিয়েই কংগ্রেসের বিপরীত অবস্থানে ছিল। দীর্ঘদিন ধরে বাংলার রাজনীতিকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে এই বামপন্থী দলটি কংগ্রেসের সাংগঠনিক দুর্বলতাগুলিকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করেছিল। অতুল্য ঘোষের নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস কখনোই সাধারণ মানুষের কাছে দলকে নিয়ে যায়নি। গ্রামে ধনী কৃষক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ আর শহরে মাঝারি ব্যবসায়ীরাই ছিল ঘোষ মেশিনের (তখন অনেকে অতুল্য ঘোষের নেতৃত্বাধীন  বাংলার কংগ্রেসকে ঘোষ মেশিন বলত) প্রধাণ তৈল সরবরাহকারী এবং মদতদাতা। সিপিএম চেয়েছিল কংগ্রেস সংগঠনের কোমর ভেঙে দিতে। এর জন্য দরকার ছিল ক্ষমতার ভরকেন্দ্র বদলে দেওয়া। অন্তত গ্রামাঞ্চলে যুক্তফ্রন্ট সরকার সেটা করতে পেরেছিল। জমির ঊর্ধসীমা বেঁধে দিয়ে এবং ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে কংগ্রেসের প্রধান শক্তি গ্রামীণ জোতদার শ্রেণীর হাত থেকে প্রচুর জমি কেড়ে নিয়ে তাদের প্রভাব শেষ করে দিয়েছিল নতুন সরকার। শুধু তাই নয়, উদ্বৃত্ত ও বেনামী জমি উদ্ধার করে  ভূমিহীন ও প্রান্তিক চাষিদের মধ্যে বন্টন করে অতি দ্রুত গ্রাম বাংলার বড় অংশের মানুষের মন জয় করে নিয়েছিল সিপিএম। কারণ, ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তর ছিল সিপিএমের হাতে আর তারা এই কাজে তাদের কৃষক সভাকে যুক্ত করেছিল। ফলে প্রত্যন্ত গ্রামেও সিপিএম তার সংগঠনকে পৌঁছে দিতে পেরেছিল। প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার মাত্র নয় মাসের মতো সময় ক্ষমতায় ছিল। কিন্তু এর মধ্যেই বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে বাংলার রাজনীতিকে অনেকটাই বদলে দেয় যুক্তফ্রন্ট সরকার বিশেষত এর প্রধান চালিকাশক্তি সিপিএম।

১৯৬৭ সাল অন্য একটি কারণেও বাংলার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠিত হওয়ার কিছুদিন পরেই এরাজ্যে শুরু হয় উগ্র বাম আন্দোলন। যে আন্দোলনের সৃষ্টিকর্তা ছিল সিপিএমেরই একটি উগ্র গোষ্ঠী যারা মনে করত সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমেই সমাজ বদলে দেওয়া যায়। এর জন্য অবাধে ব্যক্তিহত্যাও অন্যায় নয়। উগ্র বামপন্থী নকশাল আন্দোলনের কারণ বা প্রকৃতি আলোচনার পরিসর এখানে নেই। কিন্তু এটা ইতিহাস যে এই আন্দোলনের জন্মদাতা সিপিএমের একটি উগ্র বাম গোষ্ঠী  যারা মনে করত বিশ্ব বিপ্লবের নেতা হচ্ছেন চীনের চেয়ারম্যান মাও সে তুং। চীনের চেয়ারম্যানকে নির্দ্বিধায়  ভারতের চেয়ারম্যান বলে মানা যেতে পারে। বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারত বাংলাদেশের মুক্তি বাহিনীর সমর্থন করে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছিল। ওই যুদ্ধে চীন যেহেতু পাকিস্তানের পক্ষে ছিল তাই বাংলার কিছু নকশাল নেতা গণহত্যাকারী পাকিস্তানের সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খাঁকেও বিপ্লবী নেতা বলে মেনে নিতে দ্বিধা করেননি। এই অর্থহীন হিংসার প্রকোপ থেকে বাংলার রাজনীতি আর কখনও মুক্তি পায়নি। এখনও সেই হিংসার সংস্কৃতি বাংলার রাজনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে থেকে গেছে। তাই ১৯৬৭ বাংলার রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। তবে বাংলার রাজনীতির অবনমনের জন্য এই সালটিকে মনে রাখা হয়। এই রাজনৈতিক অবনমনের জন্য সম্পূর্ণ দায়ী বামপন্থীরা বিশেষত সিপিএম। কারণ ১৯৬৭ সালে তারা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হবে এটা তারা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি। তারা ভেবেছিল ক্ষমতায় আসবে কংগ্রেস আর কংগ্রেসকে জব্দ করতে জমি আন্দোলন শুরু করা হবে যতটা সম্ভব হিংসাত্মক উপায়ে। কিন্তু বামপন্থীরা ক্ষমতায় এসে যায়। হয়ত অনেক কর্মসূচির রূপায়ণও ঘটায় দ্রুততার সাথে। কিন্তু নিজেদের উগ্রবাদী অংশকে আন্দোলনের পথ থেকে সরাতে পারেনি। তাদের এই ভুলের ফলে বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতি তলিয়ে গেল গভীর অন্ধকারের অতলে, অন্তত বেশ কিছুকালের জন্য।

১৯৬৭ থেকে ১৯৭২ এই পাঁচ বছর পশ্চিম বাংলার রাজনীতি প্রায় এক অন্ধকারময় যুগে প্রবেশ করেছিল হিংসা এবং অস্থিতিশীলতার কারণে। এর গভীর প্রভাব পরবর্তীকালে রাজনীতির উপরও পড়েছিল। হিংসা এবং রাজনৈতিক অসহনশীলতার হাত থেকে বাংলা এখনও মুক্তি পায়নি। ১৯৬৭ সালে ক্ষমতায় আসা বাম দলগুলি শিল্পমালিকদের এ রাজ্যে ব্যবসা করার পথে নানা বাধা তৈরি করতে থাকে। এমনিতেই জঙ্গি ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের জন্য এ রাজ্যের বিশেষ “খ্যাতি” ছিল। এরপর নতুন যুক্তফ্রন্ট সরকার প্রকাশ্যে ঘোষণা করে যেকোনও ‘গণতান্ত্রিক আন্দোলন’ দমনে পুলিশ যাবে না। এরপর কল-কারখানায় মালিক কিংবা ম্যানেজাররা ঘেরাও কিংবা নানা ধরনের হেনস্তার মুখোমুখি হলেও পুলিশ তাঁদের সাহায্য করত না। রাষ্ট্রের সাহায্য ও সহায়তা না পেলে শিল্প-বাণিজ্য কোনও কিছুর উন্নয়নই সম্ভব নয়। বাংলার নতুন সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে শিল্প মালিকরা তাই একে একে বাংলা ছাড়তে থাকে। এক শিল্পোন্নত রাজ্য ক্রমেই অর্থনৈতিক বৃদ্ধির নিরিখে নীচের দিকে নামতে থাকে। আর নকশাল আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্যই ছিল এ রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেওয়া। শিক্ষাক্ষেত্রে প্রায় এক নম্বরে থাকা বাংলা তার গরিমা হারিয়ে ফেলে। বাংলার সমাজের সর্বত্র মধ্যমেধার প্রাধান্য শুরু হয়।

এই পরিস্থিতিতে ১৯৭২ সালে কংগ্রেসের ফিরে আসা ছিল কেবল সময়ের অপেক্ষা। ১৯৭১ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনেই কংগ্রেসের উত্থানের লক্ষণ স্পষ্ট হয়েছিল। পাঁচ বছরের অস্থিতিশীলতা, বিশৃঙ্খলা, হত্যার রাজনীতিতে ক্লান্ত মানুষ কংগ্রেসকেই আবার আঁকড়ে ধরে। বিভিন্ন জনমোহিনী সিদ্ধান্ত নিয়ে কেন্দ্রের কংগ্রেস সরকার  ইতিমধ্যেই যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। আর ভারত-পাক যুদ্ধে পাকিস্তানকে পর্যুদস্ত করে, বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামীদের পাশে দাঁড়িয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির কাজে সহায়তা করে ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস তখন দেশে এক অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ১৯৭২ সালে পশ্চিম বাংলায় বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস বিপুল জয় পায়। পরাজিত সিপিএম এবং অন্য দলগুলো রিগিং-এর অভিযোগ তুলেছিল এবং বেশ কিছু কেন্দ্রে রিগিং-এর অভিযোগ মিথ্যেও ছিল না। কিন্তু সার্বিকভাবে কংগ্রেসের পক্ষে জনসমর্থন যা ছিল তাতে বিধানসভা নির্বাচনে বিরাট জয় পেতে কোনও অসুবিধা হত না। তবু জয় নিশ্চিত করতে এক শ্রেণীর নব্য কংগ্রেস কর্মী অতিরিক্ত উৎসাহ দেখাতে শুরু করে। কয়েকটি কেন্দ্রে বুথ দখল, রিগিং চলে অবাধে।  বরানগর কেন্দ্রে জ্যোতি বসুকে হারিয়ে দিতে ব্যাপক রিগিং-এর আশ্রয় নেওয়া হয়। ভারতীয় রাজনীতির বেশ ‘দক্ষ’ খেলোয়াড় সিপিএম এর পূর্ণ সুযোগ নিয়েছিল। বাস্তবে রিগিং হয়েছিল মাত্র অল্প কিছু আসনে। কিন্তু বরানগরে জ্যোতি বসুর পরাজয়কে সামনে রেখে পরের পাঁচ বছর বিধানসভা বয়কট করে এবং কংগ্রেসের রিগিং-এর বিরুদ্ধে নিরন্তর প্রচার চালিয়ে সিপিএম বাংলার রাজনীতিতে নিজেকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে আর বাংলার বড় অংশের মানুষকে নিজেদের প্রভাবে প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়। ১৯৬৭-৭২ সময়কালে যে ব্যাপক রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও বিশৃঙ্খলা চলেছিল বাংলার রাজনীতিতে তার দায় কমিউনিস্টরা কিছুতেই এড়াতে পারে না। কিন্তু ১৯৭২ থেকে ১৯৭৭ সালের কংগ্রেস শাসনে দলাদলি, দুর্নীতি এবং দেশে রাজনৈতিক স্বৈরাচারের উদ্ভব সিপিএম দলটিকে সাহায্য করেছিল বাংলার মানুষের সামনে নিজেকে নতুন ভাবমূর্তি নিয়ে হাজির করতে। ১৯৭৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সিপিএমের বিপুল জয় প্রমাণ করে পাঁচ বছরে দলটি এক সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়েই রাজনীতি করেছিল এবং নির্বাচনে তার ফলও পেয়েছিল।

১৯৭২ সালের নির্বাচন পশ্চিম বাংলার রাজনীতিতে এক ঐতিহ্যের জন্ম দিয়েছিল। অবশ্যই সেটি এক খারাপ ঐতিহ্য। শক্তিশালী দল নির্বাচনে জিততে প্রয়োজনে অন্যায়ের আশ্রয় নিতে পারে। বিশেষত সেই দলটির হাতে যদি শাসন ক্ষমতা থাকে। ভাবতে অবাক লাগে যে দলটি এই রিগিং-এর বিরুদ্ধে লড়াইকে পুঁজি করে ১৯৭৭ সালে এ রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছিল, তারাই  পরবর্তীকালে জয়ের জন্য একই রাস্তা নিতে শুরু করে। সিপিএমের শাসন যত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়, তত বেশী অন্যায় কাজের আশ্রয় নেওয়া হতে থাকে নির্বাচনে। বুথ দখল, ছাপ্পা ভোট,  রিগিং, বিরোধী দলের সমর্থকদের ভোটকেন্দ্র থেকে তাড়িয়ে দেওয়া, বিরোধী দলের কর্মী সমর্থকদের বাড়িতে থান কাপড় পাঠিয়ে তার স্ত্রীর আসন্ন বৈধব্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া- বাংলার রাজনীতিতে বেশ “চমৎকার” কিছু ঐতিহ্যের সূচনা করেছিল সিপিএম। এই সবই হয়েছিল রাজনৈতিক ক্ষমতাকে কুক্ষিগত রাখার লক্ষ্যে। ১৯৭৭-এর পর তথাকথিত কমিউনিস্ট দল সিপিএমের কাছে ক্ষমতা আর সমাজ বদলের কোনও হাতিয়ার ছিল না। ক্ষমতা হয়ে উঠেছিল কায়েমী স্বার্থ বজায় রাখার এক বড় অস্ত্র। বিপ্লবের স্বপ্ন বহুদিন আগে মৃত্যুবরণ করেছিল। যা পড়েছিল তা হল ক্ষমতাকে যেকোনও উপায়ে ধরে রেখে রাজনীতিতে টিকে থাকা।  ১৯৭৭ থেকে ২০১১ দীর্ঘ ৩৪ বছর ক্ষমতায় থাকার রেকর্ড করতে পেরেছিল সিপিএমের নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট।  সমাজ, রাজনীতিকে বদলে দেওয়ার, উন্নতির দিকে নিয়ে যাওয়ার সুযোগও পেয়েছিল অনেক। কিন্তু করেনি। অতিরিক্ত  ক্ষমতা কেন্দ্রীক রাজনীতি, স্বৈরাচার তাদের পতন ডেকে এনেছিল। এই পতন অনিবার্যই ছিল।

CPIM-TMC

যেকোনও রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রকৃত পর্যালোচনা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে বিশ্লেষণ করতে গেলে তার অতীতের অনুসন্ধান বিশেষভাবে জরুরি। কারণ, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের রূপরেখা তৈরি করতে হয়। পশ্চিম বাংলার জনজীবনে সততা, মুক্ত ও গণতান্ত্রিক সমাজের ধারণাগুলো জনপ্রিয় হয়েছিল ২০১১ সালের নির্বাচনের আগে। কারণ, বাংলার সমাজে এগুলোর অভাব ছিল। উপরন্তু সিপিএমের সর্বনিয়ন্ত্রণকামী মানসিকতার বিরুদ্ধে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লড়াই মানুষকে প্রভাবিত করেছিল। এই লড়াই কেবল তৃণমূল কংগ্রেসের লড়াই ছিল না। সমাজের একটা বৃহত্তর অংশ এই আন্দোলনের সাথে নিজেদের যুক্ত করেছিল বাংলার সমাজ পরিবর্তন এবং এক উন্নত সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। কিন্তু গত দশ বছরের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে যে মানুষের সেই স্বপ্নপূরণ হয়নি। তার বদলে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ও স্বাধীনতার উপর বার বার হস্তক্ষেপ, সমাজের কোথাও প্রতিবাদ দানা বাঁধতে না দেওয়া, স্থানীয় স্তরে পেশীশক্তির আস্ফালন, সমাজের সর্বত্র দুর্নীতির উৎকট উপস্থিতি প্রমাণ করেছে বাংলার রাজনীতিতে পরিবর্তন হয়নি, বরং তা মারাত্মকভাবেই অবনমনের পর্যায়ে আছে। সর্বোপরি রাজনৈতিক হিংসা এক ভয়ংকর পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিগত ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে হিংসা এবং পেশীশক্তির প্রয়োগ তার সমস্ত সীমা অতিক্রম করেছে। সবচেয়ে চিন্তার বিষয় যারা এই ধরনের কাজে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত তারা সাজা না পেয়ে সমর্থন পাচ্ছে। ফলে হিংসা এবং দুর্নীতির বৈধকরণ হচ্ছে। এই কারণেই ২০২১-এর ভোট পশ্চিম বাংলার সমাজ ও রাজনীতিতে এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আর এই কারণেই ২০২১ পশ্চিম বাংলার রাজনীতিতে আর একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। পশ্চিম বাংলার আগামীটা কেমন হতে পারে তা ঠিক হবে এই নির্বাচনে। আশা করা যায়, অবাধ ভোট হলে মানুষ এক উন্নত সমাজের লক্ষ্যেই তাঁদের রায় দেবেন।