‘সিল্ক রুট’ যাওয়ার প্রস্তাব শুনে এক কথায় রাজী হয়ে গেলাম। বিশেষ করে ভ্রমনসঙ্গী যেখানে জয়দেব গোস্বামী, কাজল, তপন, সুপ্তি ও আমার পরিবার। সিকিম সরকারের পারমিট করার জন্য গোটাকতক পাসপোর্ট সাইজ ছবি, ভোটার আই.ডি. কার্ড ও প্রতিলিপি সঙ্গে নিয়ে শুধু যাওয়ার অপেক্ষা।

     মার্চ মাসের এক সকালে দার্জিলিং মেলে পৌঁছলাম এন.জে.পি। ‘বলেরো’ গাড়ি নিয়ে ললিত হাজির হতেই যাত্রা শুরু। যাব সিলারিগাঁও।

     মহানন্দা ওয়াইল্ড লাইফ স্যাঞ্চুয়ারী, সেবক, করোনেশন ব্রিজ ছাড়িয়ে চললাম কালিম্পং এর দিকে। পথে চিকেন মোমো দিয়ে চা পানের জন্য খানিক বিরতি। তিস্তা ব্রিজ পার হয়ে ঘিঞ্জি কালিম্পং হয়ে পেডং-এর পর সিলারিগাঁও। চড়াই এর সাথে সাথে ক্রমশ বাড়ছে পথের দুধারের সৌন্দর্য। পাইন গাছে ভরা ‘সায়লেন্ট ভ্যালি’র পর বড় বড় পাথর ফেলা দু-কিলোমিটার রাস্তা অসম্ভব খারাপ। এন.জে.পি থেকে প্রায় চার ঘন্টা পর পৌঁছলাম ৬০০০ ফুট উচ্চতার সিলারিগাঁও। অনেকে বলেন ‘নিউ দার্জিলিং’।

     থাকা ‘রেনু হোম স্টে’তে(০৯৮০০৪৮৬৬০৮/০৯৮০০৮০০৩৯৯)। সাদর অভ্যর্থনা জানিয়ে টকাটক লাগেজ তুলে নিয়ে গেল ওপরে। ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে উঠে এলাম হোম স্টে’র বারান্দায়। মোট তিনটে ঘর। নির্ধারিত ঘরে ঢুকেই হাফ সোয়েটার, উইন্ডচীটার, শাল আর মাঙ্কি ক্যাপ চাপিয়ে চা-এর অর্ডার।

     চারিদিকে পাহাড়ের কোলে ছোট্ট গ্রাম। কোলাহল বলতে সামনের গাছে নানা ধরনের পাখির ডাক। থেকে থেকে মেঘের আনাগোনা। বারান্দা থেকে দেখা যায় নীচে ছোট্ট স্কুলটা।

গ্রামের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের জন্য। আর কিছু ঘরবাড়ি। ১০-১২টি হোম স্টে’র ব্যাবস্থা আছে গ্রামে। ট্যুরিস্টরা এলে বাড়িয়ে দেয় সাহায্যের হাত। সন্ধ্যে ছটা থেকে রাত নটা অব্দি জেনারেটর চালিয়ে আলোর ব্যবস্থা করে যাতে শহুরে মানুষের কষ্ট না হয়।

     বারান্দা লাগোয়া ছোট্ট ক্ষেতে রাই শাক, ধনে পাতা, জিরা পাতা, আদা গাছ। পেস্টিসাইডের প্রয়োগ নেই। দুপুরের মেনুতে টাটকা সেলারি শাক কমন। আগে ‘সেলারি শাক’ পাওয়া যেত এখানে। সেই থেকেই নাম সেলারিগাঁও বা সিলারিগাঁও। এখন পাওয়া যায় না। পুরানো স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে পেডং থেকে সেলারি গাছের চারা এনে বসিয়েছে গণেশ প্রধান। ‘রেনু হোম স্টে’র মালিক। সাত মাইল দূরে এক কারখানায় কাজ করে। যাওয়া আসা নিয়ে রোজ ১৪ কি.মি. হাঁটা। বাজার আসে পেডং থেকে।

     কপাল ভাল হলে বারান্দায় বসে দেখা যায় কাঞ্চনজঙ্ঘা। তিস্তার অববাহিকা দেখার জন্য দেড় কি.মি. দূরের রমিতি ভিউ পয়েন্ট। বর্ষাকালে ঐ রাস্তায় বেড়ে যায় জোঁকের উৎপাত। আছে ডামসাং ফোর্ট। মেঘলা আকাশকে সঙ্গী করে এসেছি। অতএব কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পাওয়ার আশা বৃথা। খারাপ আবহাওয়ার কথাটা ললিত এন.জে.পি.তেই  বলেছিল। দুদিন থাকার মাঝে একবারের জন্য দর্শন পাইনি সূর্যের।

     ‘হোম-স্টে’তে থাকার অভিজ্ঞতা ছিল না। এত ভাল সেটা ভাবিনি। আপ্যায়নের কোন খামতি নেই। সব সময়ে নজর যাতে কোন অসুবিধে না হয়। চাইলেই পাওয়া যাচ্ছে সুস্বাদু চা। দুটো দিন আরামে কাটিয়ে রেনুদির হাতের মোমো দিয়ে ব্রেকফাস্টের পর ললিতের গাড়িতে চললাম ‘ঋষি’। সাইলেন্ট ভ্যালীটা দেখার লোভ সামলাতে পারিনি। অনেকটা সমতলভূমিতে এসে বুঝেছি নামটা সার্থক। শান্ত পরিবেশে ১৭৮০তে তৈরি ‘সানচোডর গুম্ফা’ দেখে চললাম ঋষির দিকে।

     ভূটান, দার্জিলিং হয়ে সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের তফাৎ গড়ে দুধারে ঘন জঙ্গলে ঘেরা পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলেছে ঋষিখোলা নদী। নদী থেকেই জায়গাটার নাম ঋষি বা রেষি। নদীর পাড়ে গাড়ি থামতেই গোটা সাতেক কুকুর আর ‘রেষি রিসর্টে’র(০৯৯৩২৭৪৪৪০৭) দুজন কর্মচারী বাঁশ ও কাঠের তৈরি অস্থায়ী সাঁকো পেরিয়ে চলে এল আমাদের কাছে। মালপত্র নিয়ে চলল রিসর্টে। সাঁকোর নীচ দিয়ে তীব্র বেগে বয়ে চলেছে কাঁচের মত স্বচ্ছ জল। রিসর্টে পৌঁছে মালপত্র ঢুকিয়ে দিল আলাদা আলাদা ঘরে। ঘরের সামনে সরু একফালি বারান্দা। বসে থাকলে কানে আসে স্রোতের আওয়াজ। চোখে পড়ে নানা ধরনের পাখি। নিশ্চিন্তে উড়ে বেড়াচ্ছে। একঘেয়েমির কোন জায়গা নেই।

    ঋষির হোমস্টেতে খাওয়া বলতে চিকেন ও ডিম। শিলারিগাঁও এর মত। মাছ পাওয়া যায় না। নদীর সুস্বাদু ছোট মাছ খাইয়েছিলেন একদিন। মাছ ধরার কায়দা অদ্ভুত। সকালবেলা লোকজন আর জেনারেটর নিয়ে চললেন সেবেস্টিয়ান। জেনারেটর চালিয়ে নদীর জলে কারেন্ট দিয়ে মাছ ধরা। কিলো দু/তিনেক মাছ ধরে এলেন ১২ টা নাগাদ। পদ্ধতিটা মন থেকে মেনে নিতে পারিনি। এটা নিয়ে অনেকে প্রতিবাদ করেছেন বলে শুনেছি।

     অনেকটা এলাকা নিয়ে রেষি রিসর্ট। আছে নানা ধরনের, রঙের, বাহারের ফুল। সাজানো গোছানো রিসর্টের খরগোস, লাভ বার্ড আলাদা আকর্ষণ। পিছনে জঙ্গলের গাছে উড়ে বেড়ায় নানা ধরনের ও আকারের পাখি। নদী পেরিয়ে পায়ে পায়ে চলে যাওয়া যায় লেপচা গ্রাম। অনেকটা উঁচুতে।

     সুন্দর একটা প্রাকৃতিক পরিবেশে দুদিন কাটিয়ে ব্রেকফাস্টের পর অন্য বোলেরো গাড়িতে রওনা হলাম ‘জুলুকের’ দিকে। সিল্ক রুটের প্রবেশ দ্বার। ক্রমশ উচ্চতায় ওঠা। যত উঠছি বেড়ে যাচ্ছে ঠান্ডার প্রকোপ। বিকেলের আগেই পৌঁছে গেলাম ৯৪০০ ফুট উচ্চতার ‘গোপাল প্রধানের’ ‘দিল্মায়া রিট্রীট’(০৯৬০৯৮৬০২৬৬/০৭৮৭২৮৮৩২৬৪)। একতলার কাঠের তিনটে ঘরে আমাদের থাকার ব্যবস্থা।। এখানেও হোম স্টে। শীতের প্রকোপের সঙ্গে ঝোড়ো বাতাস। অপেক্ষা করছি সূর্যাস্ত দেখার জন্য। কালো মেঘের নীচ দিয়ে দেখা যাচ্ছে সূর্যের আলোর রশ্মি। দূরের নীল পাহাড়কে কুয়াশার মাঝ দিয়ে সূর্যাস্তের যে বর্ণময় রূপ সেদিন দেখেছি ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষমতা আমার নেই। আগুনের গোলা যেন ঠিকরে বের হচ্ছে আকাশ থেকে। নীল আকাশে আলোর ফুলঝুরি। অন্ধকার নামতে আর বাইরে থাকা সম্ভব ছিল না।

     পূর্ণিমার চাঁদ দেখার লোভ সামলাতে না পেরে কাঁপতে কাঁপতে এলাম বাইরে। পরিষ্কার আকাশে ঝলমল করছে চাঁদ। কলকাতার মতো নিস্প্রভ নয়। অসাধারণ এক পূর্ণিমার রাতের সাক্ষী হয়ে রইলাম। অভিজ্ঞতার ঝুলিতে দুধুয়া, নাগারহোল, ভূটানঘাট, গরুমারা, হৃষিকেশের এরপর এল জুলুক।

     ভোর চারটের মধ্যে বের হতে হবে সূর্যোদয় ও চোখ ধাঁধানো কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে। সাড়ে তিনটে নাগাদ গরম গরম চা পৌঁছে গেল ঘরে। অন্ধকারের মধ্যে বের হয়ে সানরাইজ পয়েন্টে যখন পৌঁছলাম আকাশে অল্প আলোর ছোঁয়া। মেঘের আনাগোনা আছে। সূর্য উঠবে উঠবে করছে। হাওয়ার দাপটে গাড়ির বাইরে থাকা দায়। সূর্যের দেখা মিলতেই ধীরে ধীরে কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়ায় শুরু হল রঙের খেলা। সোনালী রঙে সেজে উঠল কাঞ্চনজঙ্ঘা। চোখ ফেরানো যায় না। মেঘের বাধা পেরিয়ে নানা রঙের রশ্মি নিয়ে উঠলেন সূর্যদেব। স্বর্গ আছে কিনা জানিনা আমার কাছে এটাই স্বর্গ। সূর্য উঠতেই কাঞ্চনজঙ্ঘার রঙ মেশানো রূপ উধাও। সোনালীর রঙের জায়গায় সাদা বরফে ঢাকা। বরফে ঘেরা পথকে সাথী করে এগিয়ে চলি ‘টুকলা’র বাবা হরভজন সিং এর আদি বাবাধাম এবং বাবার বাংকার এর দিকে। পথে শিকার মুখে ‘মাউন্টেন ওয়েলস’ গাড়ির সামনে এলেও ছবি তোলার সুযোগ দেয়নি। গ্যাংটক থেকে ছাঙ্গু লেক হয়ে নতুন বাবা মন্দিরে যান অনেকে। টুকলায় আছে আদি বাবা মন্দির। উচ্চতা প্রায় ১৪০০০ ফুট। রোদ ঝলমলে আকাশ। শরীর কাঁপানো ঠান্ডায় কর্তব্যরত এক জওয়ানকে চা পাওয়া যাবে কিনা বলতেই সামনের ক্যান্টিন দেখিয়ে দিলেন। বিনা পয়সায় চা আর গরম জলের ব্যবস্থা। এর থেকে ভাল কিছু হতে পারে না। কিছুটা সময় কাটিয়ে এলাম ‘কুপুকে’। বরফে ঢাকা এ্যালিফ্যান্ট লেকের মধ্যে খানিকটা নীল জল। ‘জেলেপ লা পাস’ এর মুখ অব্দি গিয়ে ফেরার পালা।

     থাম্বি ভিউ পয়েন্ট(১১২০০ ফুট) থেকে দেখলাম আঁকাবাঁকা জিলিপির প্যাঁচের মতো সিল্ক রুটের আসল রূপ। ৯৫টা বাঁক নিয়ে সিল্ক রুট। রাতের অন্ধকারে ঐ রাস্তা দিয়ে গেছি ভাবতে পারছিলাম না। কিছু বুঝতে পারিনি। কথিত আছে নাথু-লা পাস হয়ে ভারত, তিব্বত ও চীনের রেশমের ব্যবসা চলত বিনিময় প্রথার মাধ্যমে। চীনের রেশম আসত কুপুক, জুলুক, পেডং হয়ে কালিম্পং। তাই যোগাযোগকারী রাস্তার নাম হয়েছে ‘সিল্ক রুট’।

     এবার ফেরার পালা। জুলুকে ব্রেকফাস্ট করে চললাম আরিটারের দিকে। দুপুর নাগাদ পৌঁছে গেলাম আরিটার। আরিটারে থাকা মানে বিশ্রাম নেওয়া। আরিটার লেক, মানখিম ভিউ পয়েন্ট, মনেস্ট্রি, পাহাড়ের চূড়ায় শিব মন্দির দেখার পর ভ্রমনের ইতি। তবে শিলারিগাঁও, ঋষি ও সিল্করুট দেখার পর আরিটার সেভাবে মন কাড়তে পারেনি।

     দার্জিলিং মেলে ফেরার সময় ঘুরে ফিরে মনটা চলে যাচ্ছিল কদিনের ফেলে আসা আনন্দের দিনগুলিতে।