পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী কিছুদিন আগে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘বাংলার হারানো গৌরব’ ফেরানোই এখন তাঁর লড়াই(এই সময়, ২৭ জুন, ২০১৫)। সম্ভবত তিনি উপলব্ধি করেছেন, কাজটা বেশ কঠিন। তাই সচেতন ভাবে ‘লড়াই’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এ আলোচনার শুরুতেই আমরা বুঝে নিতে চাইব বিগত ছয় দশকে বাংলা কী কী হারিয়েছে। হারানোর হিসেব না করলে ফিরে পাওয়ার কৌশল ঠিক করা যায় না।
     সম্ভবত সবাই একমত হবেন, স্বাধীনতার পূর্বে বাংলা মূলত যে চারটি ক্ষেত্রে অন্য প্রদেশের তুলনায় এগিয়ে ছিল তা হলো- শিক্ষা, সংস্কৃতি, শিল্প-উৎপাদন ও কৃষি। কৃষি ছাড়া প্রথম তিনটি ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ তার অতীত গৌরব নিঃসন্দেহে হারিয়েছে। হালে ধান উৎপাদনে ভারতে শীর্ষস্থান অধিকার করে বাংলার কৃষকরা কৃষিক্ষেত্রে নিজেদের সম্মান বজায় রেখেছেন। এই প্রবন্ধে আমরা অবশ্য মূলত শিল্পক্ষেত্রেই আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখব। প্রথম ভাগে আমরা পশ্চিমবঙ্গে শিল্পের অধোগতির কারণ বুঝে উঠতে চাইব। দ্বিতীয় ভাগে আলোচনা থেকে উঠে আসা প্রশ্নের নিরিখে, কয়েকটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব সরকারে কাছে রাখব।

WB

শিল্প উৎপাদনে অধোগতির সম্ভাব্য কারণ
গত ছয় দশকে পশ্চিমবঙ্গে শিল্প উৎপাদনের দক্ষিণমুখী প্রবণতার কারণ দু’ভাবে বুঝতে চাইব। এক, আজকের প্রজন্ম সমস্যাটা কি ভাবে বিশ্লেষণ করছেন? এই মিডিয়া শাসিত সময়ে যে কোনো সমস্যার বিশ্লেষণে নাগরিকের মনোভাব বোঝা খুব জরুরি। ‘বাস্তবে আমি কী’ তার চেয়েও বেশি দরকার, লোকে ‘আমায় কী ভাবছে’ সেটা জানা। দুই, প্রকৃত কী কী কারণে পশ্চিমবঙ্গ দিন দিন শিল্প উৎপাদনে পিছিয়ে পড়েছে সেটাও বুঝতে চাইব আমরা।
বর্তমান প্রজন্মের চোখে সংকটের কারণ
বর্তমান প্রজন্মের মনোভাব বুঝতে একটি চটজলদি প্রাথমিক সমীক্ষা(পাইলট সার্ভে) করেছি আমরা। একটি সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটের সহায়তায় ৫৮ জনের মতামত জানতে পারি। অংশগ্রহণকারী কমবেশি সবাই উচ্চশিক্ষিত ও বিভিন্ন পেশায় উচ্চপদে কর্মরত। বিগত ছয় দশকে পশ্চিমবঙ্গে শিল্পের দক্ষিণায়ণ মূলত যে যে কারণে ঘটেছে বলে তাঁরা জানিয়েছেন, সেগুলি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। (আবারও মনে করিয়ে দিই- এটি চটজলদি প্রারম্ভিক একটি সমীক্ষার ফলমাত্র)। সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের মতামত- ক) ৩৬.২১ শতাংশ মনে করেন রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিফলতা প্রধান কারণ, খ) ১৮.৯৭ শতাংশ দায়ী করেছেন জঙ্গী শ্রমিক আন্দোলনকে, গ) ১৩.৭৯ শতাংশের অভিমত পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বড় অলস ও কুঁড়ে, ঘ) ১০.৩৪ শতাংশের মতে দেশভাগ শিল্পের সর্বনাশ করেছে, ঙ) ৩.৪৫ শতাংশ কেন্দ্রের মাশুল সমীকরণ ও লাইসেনসিং নীতিকে দায়ী করেছেন, চ) ৩.৪৫ শতাংশ মনে করেন বাংলায় স্থানীয় উদ্যোগপতির অভাব, ছ) ১৩.৭৯ শতাংশ অন্যান্য কারণ দেখিয়েছেন- যেমন খাদ্যাভ্যাস, বুদ্ধিজীবীদের আধিক্য, পুঁজি ও পুঁজিপতির প্রতি ঘৃণা(‘disdain’) ইত্যাদি।
     উপরউক্ত প্রথম তিনটি কারণই উত্তরদাতারা(যারা শিক্ষা ও আর্থিক সফলতার জোরে আপামর জনসাধারণের মনোভাব প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখেন) পশ্চিমবঙ্গ সম্বন্ধে একটি নেতিবাচক মনোভাবের পরিচয় দেয়। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সম্ভবত এই ক্ষমতাবান ‘এলিট’ শ্রেণির মনোভাব আঁচ করতে পেরেছেন বলেই বাংলার হারানো গৌরব ফেরানোকে লড়াই বলে মনে করছেন। সত্যিই এটা কঠিন লড়াই।
শিল্পসংকটের ঐতিহাসিক কারণ
সংকটের কারণ বিশ্লেষণে এ প্রজন্মের মনোভাব তো খানিকটা আঁচ করা গেল। এবার একটু ঐতিহাসিক কারণ খুঁজে দেখা যাক। মনে রাখতে হবে স্বাধীনতার পূর্বে বাংলা ছিল স্বদেশী শিল্পের কর্মভূমি। ছিল ‘বিশ্বের তাঁত ঘর’। ম্যাঞ্চেস্টার মিলের কাপড় বাংলার তাঁতকে ধ্বংস করতে পারেনি। কাগজ, দিয়াশলাই, লোহা, কাঁচ, কেমিক্যালস, প্রসাধনী সামগ্রী(সাবান, কেশ তেল), ফার্মাসিউটিক্যালস, জুতো, আধুনিক আয়ুর্বেদ, হোসিয়ারি, পাট, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ইত্যাদি শিল্পের পীঠস্থান ছিল বাংলা। ১৯১২-১৯৪৩ সালে বাঙালি উৎপাদনকারীরা সরকারি পেটেন্ট অফিসে ৮৮৬টি পেটেন্টের দাবিপত্র পেশ করেছিলেন। স্বাধীনতার পর তবে কি এমন ঘটল?
      আমার মনে হয় পশ্চিমবঙ্গে শিল্প সমস্যার প্রধান কারণ  দেশভাগ ও দ্বিতীয়  কারণ কেন্দ্রীয় সরকারের মাশুল সমীকরণ নীতি। রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিফলতাও গুরুত্বপূর্ণ কারণ। সে প্রসঙ্গে পরে আসব।
     ১৯৪৭ সালে দেশভাগের ফলে পশ্চিমবঙ্গে উৎপাদিত শিল্পপণ্যের এক বিশাল বাজার রাতারাতি হারিয়ে গেল। শুধু পূর্ববঙ্গের বাজারই নয়, উত্তরপূর্ব-ভারতের রাজ্যগুলোও ভৌগলিক ভাবে হাওড়া, কলকাতা থেকে অনেকটাই দূরে সরে গেল। বন্ধ হলো পূর্ববঙ্গের কাঁচামালের সরবরাহ। যেমন পাট, উন্নতমানের তুলো ইত্যাদি। বাজার ও অপরিহার্য কাঁচামাল সরবরাহ বন্ধের ফলে রক্তক্ষরণ শুরু হলো পশ্চিমবঙ্গের শিল্পে। গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো ১৯৫২ সালে কেন্দ্রীয় সরকার ঘোষণা করলেন ‘মাশুল সমীকরণ নীতি’। উদ্দেশ্য ভারতের সর্বত্র শিল্পের বিকাশ। সাধু উদ্দেশ্য সন্দেহ নেই। বলা হলো প্রাকৃতিক সম্পদ, যেমন লোহা, কয়লা ইত্যাদি কোনো বিশেষ অঞ্চলের নয়, সারা ভারতের। তাই দেশের সর্বত্র শিল্পের অপরিহার্য এই সব খনিজ পদার্থ সরবরাহ করা হবে একই মূল্যে। পরিবহণের বাড়তি খরচে সরকার ভর্তুকি দেবে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হলো পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের মতো খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ রাজ্যগুলির। বার্নপুরের লোহা বা রানিগঞ্জের কয়লার দুর্গাপুরে যে দাম, দরিয়াগঞ্জেও সেই একই দাম। পূর্ববঙ্গ ও উত্তর-পূর্ব ভারতের পণ্য বাজার দেশভাগের ফলে আগেই লুপ্ত হয়েছে। এবার উৎপাদনের ‘কমপারেটিভ অ্যাডভান্টেজ’ গেল। যেমন আসানসোলের সাইকেল শিল্পে বিনিয়োগ কমতে থাকল। লুধিয়ানায় হিরো সাইকেল(১৯৫৬)-কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠল নতুন সাইকেল শিল্প। বিখ্যাত সেন-র‍্যালে(Sen Relligh) সাইকেল(১৯৫২-য় প্রতিষ্ঠিত) একসময় বন্ধ হয়ে গেল। সরকারি নীতির সুযোগ নিতে শিল্পপুঁজি স্থানান্তরিত হলো। শিল্পরুগ্নতা যত বাড়ল- পাল্লা দিয়ে বাড়ল শ্রমিক ছাঁটাই, লকআউট। কর্মচ্যুত শ্রমিকরা অ্যান্দোলনে নামলেন। কিন্তু স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক দল অসহায় শ্রমিকদের দিকভ্রান্ত করল। পশ্চিমবাংলায় শিল্পক্ষেত্রে দেখা দিল চরম অশান্তি ও অস্থিরতা। নৈরাজ্যের অজুহাতে আরও কিছু শিল্প সংস্থা পুঁজি স্থানান্তরিত করল অন্য রাজ্যে। তাই আমার মনে হয় জঙ্গি শ্রমিক আন্দোলন পুঁজি স্থানান্তকরণের কারণ নয় বরং কেন্দ্রের মাশুল সমীকরণ নীতির ফলে (যা ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত বলবত ছিল) পুঁজির স্থানান্তরণই পশ্চিমবঙ্গে জঙ্গি শ্রমিক আন্দোলনের প্রধান কারণ। গাড়িকে ঘোড়ার আগে জুতলে ভুল হবে। বিগত কয়েক দশক ধরে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে এই মিথ্যে প্রচার করা হচ্ছে- কার্যকারণ সম্পর্কটিকে ঘুলিয়ে দেওয়ার অভিপ্রায়ে। এ প্রসঙ্গে আরও উল্লেখ করা প্রয়োজন- শুধু খনিজ সম্পদ ও বাণিজ্যিক পুঁজিই পশ্চিমবঙ্গ থেকে অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়েছে তাই নয়, মানব সম্পদও ধীরে ধীরে বাংলা ছেড়েছে। বিজ্ঞানী চিন্তাবিদ, প্রথিতযশা শিল্পী ও মেধাবী ছাত্ররা দলে দলে রাজ্য ছেড়ে না গেলে (বলা ভালো, বাধ্য না হলে) ভারতে বিনোদন ও তথ্য প্রযুক্তি শিল্পের ভরকেন্দ্র মুম্বই বা বেঙ্গালুরুর পরিবর্তে কলকাতাই হতো।
রাজনৈতিক ব্যর্থতার কারণ
ঠিক কি কারণে ব্যর্থ হলেন পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক নেতৃত্ব? এতদিনেও পশ্চিমবঙ্গ কেন পারল না ঘুরে দাঁড়াতে?
   আমাদের অস্বীকার করার উপায় নেই যে ‘ভারতবর্ষ’ একটি জাতি নয় বহুজাতির বাসভূমি। যখন জাতীয় উন্নয়নের দোহাই দিয়ে ১৯৫২ সাল থেকে বাংলা, বিহারের খনিজ সম্পদ নির্বিচারে স্থানান্তরিত হচ্ছিল, সেই দশকে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ও পূর্ব পাকিস্তানের (অধুনা বাংলাদেশ) রাজনীতিতে প্রাদেশিক ও জাতিসত্তার উন্মেষ ঘটেছে। যেমন- মহারাষ্ট্রের মারাঠিদের ‘সংযুক্ত মহারাষ্ট্র আন্দোলন’(১৯৫৬), গুজরাটিদের ‘মহাগুজরাট আন্দোলন’(১৯৫৬), তামিলদের ‘দ্রাবিড় জাতিসত্তার আন্দোলন’, প্রথম ভাষাভিত্তিক(তেলুগু) রাজ্য অন্ধ্রপ্রদেশ প্রতিষ্ঠা(১৯৫৬), পূর্ব পাকিস্তানে বাংলাভাষার স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলন(১৯৫২)। আজ স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, উপরিউক্ত প্রতিটি অঞ্চলই পশ্চিমবঙ্গকে আর্থিক ক্ষেত্রে পিছনে ফেলে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছে। বাঙালি জাতিসত্তা গঠনের আন্দোলনকে অস্বীকার ও অবহেলা করাই পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক নেতৃত্বের বড়ো ব্যর্থতা। একটু বিস্তারিত আলোচনা করা যাক।
     ব্রিটিশ শাসন শুরু হওয়ার আগেই ভারতে বিভিন্ন জাতিসত্তা যেমন তামিল, তেলেগু, বাঙালি, মারাঠি, গুজরাটি ইত্যাদি প্রত্যেকে তাদের নিজস্ব অঞ্চলে, নিজস্ব জনতত্ত্বগত(ethnic) বৈশিষ্ট্যে, নিজস্ব ভাষায়, নিজস্ব জীবন চর্চায়, নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে এবং ঐক্যবোধ নিয়ে গড়ে উঠছে। জাতি গঠনের যে ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া ভারতে চলছিল, তা ব্রিটিশ আমলে ব্যাহত হয়। এক জাতিসত্তার ফলে মানুষের মধ্যে যাতে জাতীয়তাবোধ না জন্মায় সেটাই ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের নীতি। এবং এই উদ্দেশ্যেই ১৯০৫ সালে বাংলাকে ভাগ করা হয়েছিল।
      স্বাধীনতার পর ভারতের শাসকশ্রেনি চেয়েছে এক কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র। তারা চেয়েছে(এবং এখনও চাইছে) একটি শক্তিশালী কেন্দ্র থেকে বিভিন্ন জাতিসত্তাকে শাসন, দমন ও শোষণ করতে। তাই ‘নিখিল ভারতীয় জাতীয়তাবাদ’ তত্বকে হাতিয়ার করে ১৯৫০-এর সংবিধান অনুযায়ী ভারতরাষ্ট্র আজ বিভিন্ন জাতিসত্তার সংমিশ্রণ।(কেউ কেউ বলেন বিভিন্ন জাতিসত্তার কারাগার)। পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার ছাড়া গত ছয় দশকে ভারতের প্রায় সব প্রান্তে(যেমন মহারাষ্ট্র, গুজরাট, তামিলনাড়ু, অন্ধ্র, পাঞ্জাব, আসাম, তেলেঙ্গানা) এই একমাত্রিক ‘নিখিল ভারতীয় জাতীয়তাবাদ’ তত্ত্বের বিরুদ্ধে নিজ জাতিসত্তা, জনতত্ত্বগত বৈশিষ্ট্য, নিজস্ব ভাষা, জীবন চর্চা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠার আন্দোলন হয়েছে। কন্যাকুমারীতে বিবেকানন্দ শিলার পাশেই তামিল কবি থিরুক্কুরাল-এর ১৩৩ ফুট মর্মর মূর্তি প্রতিষ্ঠা বা হালে গুজরাটে বল্লবভাই প্যাটেলের ২০০ ফুট উঁচু মূর্তি প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত জাতিগত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষারই এক প্রয়াস।
     ভাষা ও জাতিগত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠার ভারতব্যাপী এই প্রক্রিয়ার বাইরে থেকেছে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। বিহার রাজনীতি মূলত জাতপাতের লড়াইয়ে আটকে থেকেছে এতকাল। আর পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রাদেশিক, সর্বভারতীয় না আন্তর্জাতিক(‘চিনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান’) কোন ‘আইডেনটিটি’ আঁকড়ে ধরবে সেটাই ঠিক করতে পারেনি গত ছয় দশকে। কেন্দ্রের বিরুদ্ধে ‘বিমাতৃসুলভ আচরণের’ অভিযোগ দেওয়াল লিখন আর ময়দানী ভাষণেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। জাতিসত্তা গঠনের অসম্পূর্ণ প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ করতে এগিয়ে আসেনি পশ্চিমবঙ্গের কোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বই। নিজস্ব ভাষা, গৌরবময় সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনের ইতিহাস ও ঐতিহ্যপূর্ণ সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে ও সম্মান দেখাতে পারেনি বলেই আজও বাংলার হাজার হাজার স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে একটিও উপযুক্ত স্মারকস্তম্ভ গড়ে তুলতে পারল না কোনো সরকার। ‘বিনয়-বাদল-দীনেশ বাগ’ পরিণত হলো বাস টার্মিনাসে। ‘শহিদ মিনার’ বলে বর্ণিত ধর্মতলায় যে স্তম্ভটি দন্ডায়মান সেটি আসলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিজয় স্মারক। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মেজর জেনারেল স্যার ডেভিড অক্টারলোনি(David Orchterlony) মারাঠা ও গোর্খাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ের স্মারক হিসেবে ১৮২৮ সালে নির্মাণ করেছিলেন মিনারটি। তারপর ৯ আগষ্ট ১৯৬৯ সালে তৎকালীন রাজ্য সরকার এই সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ মিনারের গায়ে একটি বিজ্ঞপ্তি সেঁটে নাম পালটে লিখলেন ‘শহিদ মিনার’- ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে শহিদদের উদ্দেশে…। পরে বামফ্রন্টের এক মন্ত্রী লাল রঙে রাঙাতে চেয়েছিলেন এই মিনার! এই হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক নেতৃত্বের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর নমুনা। ব্রিটিশ শাসনকালে বাংলায় ১৭৭০ সালে(১১৭৬ বঙ্গাব্দে) ও ১৯৪৩ সালে(১৩৫০ বঙ্গাব্দে) বিদেশি শাসক সৃষ্ট ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে ১ কোটি ৩০ লাখেরও বেশি মানুষ ‘শহিদ’ হয়েছেন। তাদের কথাও কেউ মনে রাখেনি।
করনীয় কী?
আমার মনে হয়, বাংলার হারানো গৌরব ফিরে পেতে গেলে সবার আগে প্রয়োজন জাতিসত্তা গঠনের অসম্পূর্ণ প্রক্রিয়ার পুনর্জাগরণ। বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, লুপ্তপ্রায় হস্তশিল্প ও সর্বোপরি স্বাধীনতা আন্দোলনের গৌরবময় অধ্যায়কে এই প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে চাই। যেমন- ক)কলকাতার উপকন্ঠে কিছু বিশ্বমানের স্মৃতি সৌধ নির্মান করে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর মাধ্যমে শুরু হোক জাতিসত্তা গঠনের প্রথম পদক্ষেপ। ওই স্মৃতি সৌধের মধ্যে দুর্ভিক্ষে শহিদদের উদ্দেশেও নির্মিত হোক একটি স্বতন্ত্র স্তম্ভ।
     খ) শুধু স্মৃতিসৌধ নির্মানই যথেষ্ট নয়। স্মৃতিসৌধের পাশেই নির্মান হোক এক আধুনিক সংগ্রহশালা যেখানে প্রত্যেক স্বাধীনতা সংগ্রামীর নাম, ছবি ও তাঁদের আত্মত্যাগের কথা লিপিবদ্ধ থাকবে সাধারণ দর্শক ও ছাত্রছাত্রীদের জন্যে। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার গৌরবময় ভূমিকা সবার জানা উচিত। সবাইকে জানানো উচিত।
     গ) পূর্ববঙ্গ স্বাধীনতার লড়াই করেছে দু’বার। একবার ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। দ্বিতীয়বার পাকিস্তানী শাসকের বিরুদ্ধে। দ্বিতীয় স্বাধীনতার লড়াই ছিল তার জাতিসত্তার লড়াই। সে দেশের নতুন স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চ। বাংলাদেশের জনগণ আরও একটি দিন গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে- ২১ ফেব্রুয়ারি যা এখন আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস বলে সারা বিশ্বে সম্মানিত। ভারতের স্বাধীনতা দিবস(১৫ অগস্ট) আসলে বাঙালি ও পাঞ্জাবি জাতি গোষ্ঠীর কাছে এক অভিশপ্ত স্মরণ দিবস। স্বজন হারানোর দিন। ভাগ হওয়ার দিন। অঙ্গচ্ছেদের দিন। এ রাজ্যে ভাষা শহিদ নেই। কিন্তু ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রথম স্বাধীনতা ঘোষণা হয়েছিল এই রাজ্যেই। ১৯৪২ সালের ১৭ ডিসেম্বর বিপ্লবী সতীশ সামন্তের নেতৃত্বে ‘তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার’(Tamralipta National Government) গঠিত হয়েছিল ইতিহাস প্রসিদ্ধ তাম্রলিপ্ত(অধুনা তমলুক) বন্দরের পাশেই। তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার ১৯৪৪-এর সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত মুক্ত ছিল। আমার প্রস্তাব ১৭ ডিসেম্বর এ রাজ্যে ‘মুক্তি দিবস’ হিসেবে পালিত হোক। প্রস্তাবিত স্মৃতিসৌধ নির্মিত হোক তমলুক ও কলকাতার মাঝামাঝি কোনো এক স্থানে। রাজ্য সরকার ঘোষিত যাবতীয় পুরস্কার প্রদান হোক ওই ১৭ ডিসেম্বর ‘মুক্তি’ দিবসে। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ১ মে দিনটি মারাঠিরা ‘মহারাষ্ট্র দিবস’ হিসেবে মহাসমারোহে পালন করে। ওই একই দিনে গুজরাটিরা পালন করে ‘গুজরাট স্থাপনা দিবস’। ১ নভেম্বর তামিলনাড়ুতে ‘তামিলনাড়ু প্রতিষ্ঠা দিবস’ পালিত হয় আর ২ জুন পালিত হয় তেলেঙ্গানা দিবস হিসেবে।
     যে জাতি তার ভাষা, জনতত্ত্বগত বৈশিষ্ট্য ও নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সম্মান জানাতে কুন্ঠিত হয়, সে জাতির ভবিষ্যৎ কখনই গৌরবের হয় না। হতে পারে না। সে না পারে নিজেকে সম্মান করতে না পারে অন্যের সম্মান রাখতে। পশ্চিমবঙ্গের হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনার পূর্ব শর্তই হচ্ছে অতীতকে ফিরে দেখা- নিজেদের হৃত সম্মান ফিরে পাওয়া।
     বাস্তবে ভারত নামক ‘দেশ’টি বহুজাতির বাসভূমি। সে অর্থে একটি ‘যুক্তরাষ্ট্র’(Federation of States)। সংবিধান বর্ণিত ‘রাষ্ট্রসংঘ’(Union of States) নয়। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই সহজ সত্যটি অনুধাবন না করলে এ রাজ্যের হারানো গৌরব ফেরানো অসম্ভব।

                                                                (মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)