সকালবেলা ব্রেকফাস্ট টেবিলে ‘লো ক্যালোরি, জিরো কলেস্টোরেল’ ছাপ বাটার লেপে, টোস্ট চেবাতে চেবাতে  নিউজ পেপার পড়ছেন তো ? নিয়মিতই পড়ছেন তো ? তাহলে নিশ্চয় খেয়াল করেছেন, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর রঘুরাম রাজন ভবিষ্যৎবাণী ? বিশ্বে নাকি উৎপাদনের পরিমাণ বিপজ্জনক ভাবে কমে গিয়ে, অদূর ভবিষ্যতে পুনরায় মহামন্দা হবার জোগাড় ! না, পাঁজি খুলে, গ্রহ-নক্ষত্র দেখে, রঘুরাম জ্যোতিষী কোন দিনক্ষণ অবশ্য এখনই স্থির করে দিতে পারেননি। তবে কি জানেন, ২০০৮’র মহামন্দার সঠিক ভবিষ্যৎবাণী করা ঘরপোড়া অর্থনীতিবিদ তো, তাই রঘু দেখেছো ফাঁদ দেখনি বলে সিঁদুরে মেঘ কে অবহেলা করার উপায় তো নেইই বরং, চারপাশের উদার-অর্থনীতির অবস্থা বজ্র আঁটুনি ফস্কাগেরোর মতোই। গ্রিস তো দেউলিয়া হবার জোগাড়। হিটলারের জার্মানি ছাড়া, ইউরো অঞ্চলের প্রায় সব দেশের অর্থনীতিরই স্বাস্থ্য, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের রুগ্ন শিল্পের দুঃস্থ কর্মচারীর মতই। আর এদেশেও আপনি যদি নিতান্তই ‘হা-ম্বানি’ কিম্বা ‘ফুল-দানি’ গোছের কোন কেউকেটা না হয়ে থাকেন, তাহলে শম্বূক গতির স্যালারি বৃদ্ধির চোটে আপনারও নিশ্চয় ‘নুন আনতে পান্তা ফোরানো’র  অবস্থা ! আবার আপনার  উপর যদি ৪২% অভিশাপ পড়ে থাকে, তাহলে তো ‘গোদের উপর বিষফোঁড়া’। তাই বলছিলাম কি ব্যয় সংকোচ করুন। মেপে, অবস্থা বুঝে, পরিমিত পরিমানে খরচা করুন। আপনার অর্থ এবং তার সাথে আপনার হুজুগে দেশপ্রেমের ফোর-টুয়েন্টি মার্কা আবেগ, দুটোই। আসলে কি জানেন স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির হিসেব দেখিয়েও দেশপ্রেম তো আর ব্যাঙ্ক থেকে লংটার্ম অ্যাডভান্স পাওয়া যায় না, আর লো ট্যাক্স রেটে ক্রেডিট কার্ডও জোগাড় করা দায়। তাই আপনার সাধের দেশপ্রেমের অকারণ অপচয়ে লাগাম টেনে পুঁজিবাদী সরকারের মত একটু ‘অস্টারিটি মেসার্সে’ মনোনিবেশ করুন!

বাংলাদেশের মেয়ে সুমি। বাবা কাঠের কাজ করেন। বাচ্চা মেয়ের মন জুড়ে ‘মহানায়ক’ দেব। ঘরের দেওয়াল জুড়ে ‘মহানায়ক’ দেবের পোস্টার। কিন্তু স্বপ্নের নায়কের দেখা পাওয়া দায়। পঞ্চম শ্রেণি পাশের সার্টিফিকেট আনতে গিয়ে সটান স্কুলের ছাদে চলে গিয়ে সেখান থেকে ঝাঁপ। অতঃপর জ্ঞান এলো হাসপাতালের বেডে নাকে স্যালাইন গোঁজা অবস্থায়। দুই পায়ে অস্ত্রোপচার করতে হবে। বাবার আর্থিক সামর্থ্য নেই। মেয়ে কিন্তু হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছে “ভাবসিলাম দেব আইস্যা সিনামার মত বাঁচাইয়া দিব”। কি বলবেন ? হুজুগে ? তা তো বটেই। কিন্তু ও তো না হয় পঞ্চম শ্রেণীর মেয়ে । আর আমি ? আপনি ?

এই দেখুন না, ওয়ার্ল্ড হকি লিগে আমার দেশের স্বপ্নের দৌড় অবাহ্যত, কিন্তু আমি খবরই রাখি না। ফুটবল বিশ্বকাপের কোয়ালিফাইং খেলতে গিয়ে আমার দেশ ১ লক্ষ ৬৩ হাজারের প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপের কাছে হেরে বসল, আমার কিচ্ছু যায়ই আসে না। কিন্তু ক্রিকেটে বাংলাদেশের কাছে প্রথমবার সিরিজ হারলেই আমার দেশপ্রেমের ভিসুভিয়াসে অগ্ন্যুৎপাত হয়। অলিম্পিকে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ ছেড়ে, বিজেন্দ্র সিং প্রফেশনাল বক্সিং লিগে যোগদান করার সিদ্ধান্ত নিলেই, আমার রক্ত ‘বিপ্লবী’ আর ‘প্রতিবাদী’ অ্যান্টিবডি তে ভরে যায়। লজ্জায় মাথা কাটা যায়। পাড়ায় মুখ দেখাতে পারি না। ক্রিকেটারদের চোদ্দ পুরুষ উদ্ধার পর্ব শেষ হলেই, আমার ঘরের ছাদে উঠে, চট্টগ্রামে আর সিলেটে কিম্বা বিজেন্দ্র সিং’র বাড়িতে মিসাইল ছুঁড়তে ইচ্ছে করে। অভিজিত-ওয়াশিকুর-অনন্ত বিজয়দের রক্তের দাগ মুছতে না পারা ১৪ আনা উচ্ছন্নে যাওয়া ধর্মীয় মৌলবাদী আখড়া রাষ্ট্রকে, সুধীর গৌতমের ক্যালানির যোগ্য জবাব দিতে ইচ্ছে করে। আসলে কি জানেন, আমি হুজুগের দাস। তাই হুজুগের চোটেই আমি মাঝেমাঝে ‘পরম ধার্মিক’ ‘সত্যবাদী’এবং ‘ন্যায়বাদী’ হয়ে উঠি। তখন কিন্তু আমি দুর্নীতির বিরুদ্ধে। কথায় কথায় টু-জি কেলেঙ্কারির নামে আকাশ বেচে দেবার গল্প শোনাই, কোল ব্লক অ্যালোকেশন নিয়ে দুর্নীতির নামতা মুখস্থ বলতে পারি, কমনওয়েলথ গেমসের দুর্নীতির ‘ফিগার’ গুলো তো আমি নিয়ম করেই রিভাইজ দিই। ‘হা’ করলে হাওলা বুঝি, ‘ব’ বলতে বোফোর্স। নেমন্তন্ন বাড়িতে কব্জি ডুবিয়ে খেয়ে, খয়ের দেওয়া মিষ্টিপান ডান গালে চেপে স্বস্তির একটা ঢেকুর তুলে বলি “আরে দাদা, যে দেশের নেতারা মৃত সৈনিকের কফিন থেকে গবাদি পশুর খাবার নিয়ে দুর্নীতি করে, সে দেশের আর কিসসু হবে না, বুঝলেন?”। আসলে টিকিট কাটার লম্বা কিউ থেকে বাঁচতে পরিচিত কাউকে দেখেতে পেয়েই তিনজন কে ডিঙ্গিয়ে মাঝে ঢুকে পড়লেও আমি কিন্তু আসলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে। স্কুল-কলেজের প্রিন্টার থেকে নিজের ছেলে-মেয়ের অঙ্কের হোমওয়ার্কের প্রিন্ট-আউট নিয়ে গেলেও আমি কিন্তু আসলে দুর্নীতির বিরুদ্ধেই। ভর্তুকি মার্কা অফিস ক্যান্টিনে ৭৬ টাকার লাঞ্চ কুপনে কেটে এক্সট্রা দু হাতা ভাত নিয়ে নিজেকে উৎফুল্ল মনে হলেও, আমি কিন্তু দুর্নীতির বিরুদ্ধে। ট্রাফিক আইনে পুলিশ ধরলে লাইসেন্স সিজ হওয়া থেকে বাঁচতে ‘অন দি স্পট’ বোঝাপড়া করে নিলেও আমি কিন্তু দুর্নীতির বিরুদ্ধেই। মোটের উপর এই “ছোট্ট ঘটনা” গুলোকে আর যাই হোক সে অর্থে ঠিক জুতসই দুর্নীতি বলাই যায় না। কি বলুন ?

সোনালি চতুর্ভুজ প্রকল্পের দুর্নীতির বিরুদ্ধে মুখ খুলে সতেন্দ্র দুবে কে ইহলোক ত্যাগ করতে হয়েছে, মর্নিং ওয়াকে বেরিয়ে পুনের ওমকারেশ্বর মন্দিরের কাছে পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ থেকে গুলি খেতে হয়েছে নরেন্দ্র দাভোলকার কে, নিজের ঘরের কাছেই প্রকাশ্য দিবালোকে, ঘাড়ে গুলি খেয়ে পটল তুলেছেন গোবিন্দ পানসারে। মন্ত্রীর জমি জবরদখলের বিরুদ্ধে লেখার জন্য উত্তরপ্রদেশের সাংবাদিক যোগেন্দ্র সিং কে গত মাসে  শাহজানপুরে জ্বালিয়ে মারা হলো, মধ্যপ্রদেশের জমি মাফিয়ার বিরুদ্ধে লিখে সন্দীপ কোঠারী কেও পুড়ে মরতে হলো কদিন আগেই, অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় তিস্তা শীতলবাদ কে মিথ্যে মামলায় ফাঁসানো হলো। পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রে ঘোষণা করেছে গ্রামে দৈনিক ২৫ টাকা আর শহরে ৩২ টাকা রোজগার করলেই সে আর গরীব না। স্বাধীন ভারতবর্ষ, শহরের ৬৪% মানুষের দৈনিক জরুরী ক্যালোরির বঞ্চনা দেখেও, দাঁত ক্যালাচ্ছে।  প্রায় ৫০ লাখ শিশু পেট চালানর জন্য পড়াশুনোর অব্যহতি দিয়ে আজ শিশু শ্রমিক, ‘ফেক এনকাউন্টার’ কেসের জেল ফেরত নেতা আজ বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের হয়ে মিসকল কুড়িয়ে বেড়াচ্ছেন, কেউ নন্দীগ্রামে ‘পরিবেশ বান্ধব শিল্প’ আর  সিঙ্গুরের অনিচ্ছুক কৃষকদের ৪০০ একরের লোভ দেখিয়ে আমাকে টুপি পরিয়েছে, কেউ ১০০ দিনে দেশের কালো টাকা ফিরিয়ে এনে আমার একাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা জমা করার ঢপ মেরেছেন। আর আমি ?  আমি চাইছি দেশে দুর্নীতি বন্ধ হোক। তার জন্য কেউ একটা লড়াই করুক। আন্না হাজারে অনশন করুক। মিডিয়া খবর করুক। ‘ইন্ডিয়া অ্যাগনেস্ট কোরাপশেন’-র মত জব্বর একটা বিপ্লব হোক। বেশ একটা জমজমাটি ব্যাপার। আমার ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট নিস্তরঙ্গ জীবনে ঝিন-চ্যাক মার্কা নিখাদ আইটেম সং। আইটেম সং-এ না হয় একটু তেল-মশালা থাকে। কিন্তু বদ হজম হবে বলে কি লোকে স্পাইসি খাবার খাওয়া ছেড়ে দেবে নাকি? আর আইটেম সঙ্গের কাস্টিং নিয়ে কে আর মাথা ঘামাই বলুন দেখি ? আগে হেলেন ছিলেন, তো পরে রবিনা ট্যান্ডেন এলেন, আর এখন সানি লিয়ন। মোদ্দা কথা ভ্যারিয়েশন আর ডায়নামিক। তবেই না এ বি ডিভিলিয়ারস। তাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে কে মরল, কে বাঁচল, কে জেলে গেলো, কে গলায় দড়ি নিল, কে পুড়ে মরল, কার চাকরি কে কেড়ে নিল তা জেনে, তা নিয়ে চিন্তা করে আমি কি করব ? খাবো না গায়ে মাখবো বলুন ? কেউ একটা আইটেম সং-এ নাচলেই হল। ততক্ষণ বরং আমি, ইন্ডিয়ান ক্রিকেট টিমের বাংলাদেশ সফরে, রোহিতের কভার ড্রাইভে আর অশ্বিনের ‘ক্যারাম’ বলে ৭১’র মুক্তি যুদ্ধের আগুন খুঁজি। ততক্ষণ আমি বিজেন্দ্র সিং কে মাস্টার দা সূর্য সেন ভেবে আত্মবলিদানের অপেক্ষা করি। ততক্ষণ আমি নিজের জীবনের ব্যর্থতা ভুলে বিরাটের পুলে অনুস্কার ছায়ার পাপ-স্খলন করি। ততক্ষণ আমি আমার মেদবহুল সিলেক্টিভ দেশপ্রেমের কলবর রক্ষার্থে চিজ বেসড পিৎজা সাঁটাই। ততক্ষণ আমি নিজের কেরিয়ার গঠনের অজুহাতে, ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ালেও, অন্যের কাছ থেকে ষোলআনা দেশভক্তি আর দায়বদ্ধতা প্রত্যাশা করে ফেসবুকে সেলফি টাঙ্গাই। ততক্ষণে আমি ‘স্লিপটাইট, গুড নাইট’ গোছের বিতর্কহীন নিরীহ স্ট্যাটাস টাঙ্গিয়ে পিসফুল রতিক্রিয়ায় মননিবেশ করি।