আগস্ট মাসের ভরা বর্ষা। কলকাতা মাঝে মাঝেই ঢুবে যাচ্ছে জলের তলায়। তারই মাঝে আমি চেপে পড়লাম ইস্পাত এক্সপ্রেসে। গন্তব্য – ঘাটশিলা। শুনেছিলাম ঘাটশিলার আসল সৌন্দর্য দেখা যায় বর্ষায় ও শীতে। তাই ভরা বর্ষায় ঘাটশিলার রূপ দেখতে যাত্রা করলাম ঘাটশিলার দিকে।
সুবর্ণরেখা নদী, ফুলডুংরি পাহাড়, বুরুডি ড্যাম ও ধারাগিরি ঝরণার জন্যই পর্যটন মানচিত্রে ঘাটশিলার ঘনঘটা। আর বাঙালির উপরি পাওনা ‘আরণ্যক’ লেখক বিভুতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি। যদিও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বেশ কিছু বছর পর্যটন পুরোপুরি বন্ধ ছিল। হালফিলে ফের ভ্রমনপিপাসুদের আনাগোনা বেড়েছে।
ইস্পাত ঘাটশিলা পৌঁছতে সময় নিল ঘন্টা তিনেক। ছোট স্টেশান ঘাটশিলা কিন্তু গমগমে। সাইকেল রিকশা করে বেড়লাম হোটেল খুঁজতে। পুরোন যেসব হোটেল ছিল তাতে গিয়ে দেখি অব্যবস্থার চুড়ান্ত। ফিরে এলাম স্টেশানের কাছের হোটেলে। তারা অবস্থা বুঝে দড় হাঁকছে। দুশ টাকার ঘর ছশ টাকা। বাধ্য হয়ে সেইরকম একটা হোটেল ভাড়া করলাম। ফ্রেশ হয়ে দুপুরটা আর কোথাও বেরোলাম না।
বিকেলে বেড়লাম সুবর্ণরেখা নদী দেখতে। বড় বড় পাথরের মাঝ দিয়ে নিজের চলার পথ তৈরি করে নিয়েছে সে। এই ভরা বর্ষায় যদিও নদী বেগবতী তাও নদীর মাঝের বড় পাথরগুলোতে যাওয়া যায়। আর তার ওপর বসে থাকতে বেশ লাগে। জলের দিকে তাকিয়ে থাকলে মনে হয় নদীর সাথে আমিও ভেসে যাচ্ছি। লোক মুখে শুনেছি, সুবর্ণরেখার বালিতে নাকি সোনা পাওয়া যায়। সেই জন্যই নদীর এই নাম। তবে বর্ষার জলে টইটম্বুর সুবর্ণরেখার চরে বালির দেখা মিলল না। তাই সোনা খোঁজা ও আর হল না। ফেরার পথে পায়ে পায়ে ঘুরে নিলাম রুঙ্কিণী দেবীর মন্দির, স্থানীয় রাজবাড়ি। যদিও বাড়িটিতে এখন আর কেউ থাকেন না, আর বাড়িটিও ভগ্নপ্রায়।
পরের দিন সকালে অটো ভাড়া করে বেরিয়ে পড়লাম বেড়াতে। ফুলডুংরি পাহাড়, ধারাগিরি ঝরণা ও বুরুডি ড্যাম যাওয়ার একমাত্র বাহন হল অটো।
ধারাগিরি ঝরণা অবস্থিত এক নাম না জানা পাহাড়ের উপর ঘন বনের মধ্যে। অটো থেকে নেমে হেঁটে যেতে হয় প্রায় পনেরো মিনিট। স্থানীয় ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়। তার বদলে কিছু পয়সা পায় টুরিষ্টদের থেকে। বাড়ির একটু সাহায্য হয়। নির্দিষ্ট কোন রেট নেই। যার যেমন ইচ্ছে দেয়। কাঠুরেদের পায়ে পায়ে তৈরি পথ দিয়ে নাম না জানা , চোখে না দেখা বিভিন্ন পাখির ডাকের সাথে পা মিলিয়ে চলা। নিস্তব্ধ বনের মধ্যে ঝরণার জলে তৈরি হওয়া শীর্ণকায়া নদীর তিরতির শব্দ শুনতে শুনতে হাঁটতে ভালোই লাগে।
অবশেষে পথের শেষে দেখা পাওয়া ধারাগিরির। পাহাড়ের খাঁজ থেকে ঝরে পড়ছে ধারাগিরির ধারা। বর্ষাকাল বলে জলের ধারা বেশি। শীতের সময় প্রায় শুকিয়ে যায়। ঝরণার জল জমে একটা বনসাই লেক তৈরি হয়েছে। স্বচ্ছ কাঁচের মত ঠাণ্ডা জল, নিচের পাথর স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। চারপাশের ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে সূর্যের আলো লেকের জলে পড়ে সৃষ্টি করেছে এক মায়াময় পরিবেশের। যে মায়া দেখতে দেখতে মনে হয় বসে থাকি সারাদিন এই স্বচ্ছ ঠাণ্ডা জলে পা ঢুবিয়ে। কিন্তু ঘড়ির কাঁটা মেনে চলা মানুষের সময় কোথায় সারাদিন এক জায়গায় থাকার। তাই বেরিয়ে পড়লাম বুরুডি ড্যামের দিকে। শীতকালে বোটিং’এর ব্যবস্থা থাকলেও বর্ষাকালে সেসবের দেখা মিলল না। তবে সবুজ পাহাড় দিয়ে ঘেরা এই ড্যামটির একটি নিজস্ব সৌন্দর্য আছে।
ফেরার পথে বেড়াতে যাই ফুলডুংরি পাহাড়ে। এই পাহাড়টির আলাদা কোন বৈশিষ্ট্য নেই নামটি ছাড়া। তা সত্ত্বেও এই পাহাড়টি বাঙালির অতি প্রিয়। কারণ, সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে এই পাহাড়। এখানে বসবাসকালে তিনি প্রায়ই এই পাহাড়ে বেড়াতে আসতেন।
দুপুরটুকু রেস্ট নিয়ে বিকেলে গেলাম হিন্দুস্তান কপার মাইনস দেখতে। সুবর্ণরেখা নদীর ওপরের ব্রিজ থেকে দূরে পাহাড়ের মাঝে সুর্যের মিলিয়ে যাওয়া অদ্ভুত সুন্দর এক মায়াজালের তৈরি করে। সে মায়াজাল কাটিয়ে এগিয়ে যাই লেখকের বাড়ির দিকে। সে বাড়ি বদলে গিয়েছে অনেক। একমাত্র কেয়ারটেকার ছাড়া কেউ থাকে না। অনুরোধ সত্ত্বেও মিলল না ভিতরে ঢোকার অনুমতি। মনখারাপ নিয়ে ফেরার পথে উপরি পাওনা হিসাবে পেলাম স্থানীয় মেলা দেখার সুযোগ। কলকাতার আর পাঁচটা মেলার মতই। তবু দেখতে ভালোই লাগে। ফুচকার দামটা কলকাতার থেকে কম। স্বাদে যদিও কলকাতার ধারেপাশে না।
রাত কেটে সকাল আসে। বাড়ি ফেরার ট্রেন ধরি। মনের মধ্যে বয়ে চলে তিরতির করে ভালোলাগার স্রোত – ধারাগিরির জলের মত।
কিভাবে যাবেন – গাড়িতে কলকাতা থেকে ২৪০ কিলোমিটার। এন এইচ ৬ ধরে বাহাড়াগোড়া হয়ে চলে জামসেদপুর, সেখান থেকে ঘাটশিলা। ট্রেনে হাওড়া থেকে সকালের দিকের ইস্পাত বা লালমাটি এক্সপ্রেস ধরুন। ফেরার পথে স্টীল বা রাঁচী ইন্টারসিটি।
কোথায় থাকবেন – সবথেকে ভালো ঝাড়খন্ড ট্যুরিজম ডেভালপমেন্ট’এর রিসর্ট, বিভূতি বিহার। এছাড়া, সুহাসিতা রিসর্ট, স্টেশানের কাছে অনিন্দিতা লজ বা আকাশদীপ।
                                                                            ছবি- শুভদীপ দেবনাথ।