হঠাৎ’ ই তিন বন্ধু মিলে ঠিক করলাম যে কাছে পিঠে কোথাও দু’দিনের জন্য ডুব মারবো। সেই মতো এক বৃষ্টি ভেজা ভোরবেলা হাওড়া থেকে ব্ল্যাক ডায়মন্ডে চড়ে বসলাম। গন্তব্য কুমারডুবি স্টেশান। বেলা এগারোটা নাগাদ আমাদের কুমারডুবিতে নামিয়ে রেলগাড়ি কু ঝিক ঝিক হয়ে গেলো।
স্টেশানের বাইরে এসে একটু দড় দস্তুর করে একটা গাড়ি ঠিক করলাম। যাবো গড়পঞ্চকোট। কুমারডুবি থেকে দূরত্ব প্রায় বিশ কিলোমিটার। রাস্তা বেশ ভালো। আধঘণ্টায় পৌঁছে গেলাম। পঞ্চকোট পাহাড়ের কোলে পশ্চিমবঙ্গ বন উন্নয়ন নিগমের বাংলো আছে জানা থাকা সত্ত্বে ও,  হুটোপাটা করে চলে আসাতে সেটা বুক করা যায়নি। তাই উঠলাম পলাশবীথি লজ-এ। মাত্র দুটো ঘর থাকাতে এটাও আগে থেকে বুক করে আসা ভালো। এই ভরা বর্ষাতে আমাদের মতো পাগলের সংখ্যা বেশি নেই বলে আমরা জায়গা পেয়ে গেলাম।
পাঞ্চেত পাহাড়ের পাদদেশে সবুজে ঘেরা গড়পঞ্চকোট। প্রাচীন পূর্ব-ভারতীয় পঞ্চকোট রাজত্বের অধীনে গড়ে উঠেছিল। গড়পঞ্চকোট পাহাড়ের উচ্চতা ৬৪৬ মিটার। পাহাড়ের দক্ষিণ ঢালে ছিল নয়টি পাঁচচুড়োবিশিষ্ট টেরাকোটার মন্দির। এখন আর কোনটাই আস্তো নেই। সবই ভগ্নোস্তুপে পরিণত। পঞ্চকোট গড় থেকেই পরবর্তীকালে গড়পঞ্চকোট নাম এর উৎপত্তি। শোনা কথা যে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত নাকি এক সময় এই সিংদেও রাজত্বের ম্যানেজার হিসাবে এখানে ছিলেন।
এসব সাত পাঁচ ভাবনার মাঝে দুপুরের খানা চলে এসেছে। খেয়ে একটু বিশ্রাম করে বের হলাম মন্দিরগুলো দেখতে। হাতে সময় থাকলে পাহাড়ের ওপরটাও ঘুরে আসব। চারপাশ বর্ষার নতুন জলে ঘন সবুজ হয়ে আছে। সবুজের মাঝ দিয়ে কালো রাস্তাটা এক অসাধারণ পিকটোরিয়ালিজম সৃষ্টি করেছে। প্রধান মন্দির হল পঞ্চরত্ন মন্দির। এটি বিষ্ণুপুরের জোড়বাংলোর ধাঁচে পাথরের তৈরি মন্দির। এক সময় পুরো মন্দিরটির গায়ে টেরাকোটার কাজ ছিলো। আজ কালের পরশ আর মানুষের অবিমৃশ্যকারিতা তার বেশিরভাগই মুছে দিয়েছে। তবু আজও মন্দিরের থামে আর আর্চের মাঝে প্রি-মুসলিম সময়ের কিছু অসাধারণ টেরাকোটার কাজ বুঝতে পারা যায়। অন্য মন্দিরগুলি ‘ পিরহা ‘ ধরনের গঠনশৈলীতে তৈরি। এই বর্ষাতে অনেক মন্দিরের চারপাশে এতো জঙ্গল হয়ে গেছে যে কাছে যাওয়া গেল না।
বর্ষার জলে পাহাড়ে ওঠার রাস্তাটা একটু খারাপ হয়ে গেছে। কোন কোন জায়গাতে রাস্তা ভেঙ্গে গেছে। তবু আমরা কষ্ট করে পাহাড়ের মাথায় উঠে এলাম। ওপর থেকে নীচের বিস্তীর্ন অঞ্চল দেখা যায়। এক অপূর্ব দৃশ্য। নীচে ঘন সবুজ জঙ্গল ,দিগন্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। মাথার ওপর পুঞ্জীকৃত মেঘমালা। এই জন্যই বর্ষার পুরুলিয়া আমার এতো ভালো লাগে। আমরা তিনজনই একটা পাথরের ওপর চুপ করে বসে থাকলাম। থেকে থেকে শুধু আনন্দের পাইপের তামাকের একটা মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছে।
সন্ধ্যেতে ঘরে ফিরতে না ফিরতেই তুমুল বৃষ্টি। সুতরাং কফি সহযোগে পকোড়া খেতে খেতে জমিয়ে আড্ডা। কাল সকালে ওয়েদার ঠিক থাকলে পাঞ্চেত ড্যামে যাবো।
গড়পঞ্চকোট থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে বিখ্যাত পাঞ্চেত জলাধার। দামোদর নদের ওপর ব্যারেজ এই জলাধারটিকে তৈরি করেছে। এর ওপর দিয়ে একটি সড়ক পশ্চিমবঙ্গের থেকে ঝাড়খণ্ডে চলে গিয়েছে। সি আই এস এফ এর জওয়ানদের সাথে কথা বলে ব্যারেজটি দেখে নেওয়া যায়। দামোদরের ওপরে যখন নৌকো পারাপার করে তখন বিকেলের আলোয় একটি মায়াবী দৃশ্য তৈরি হয়। যদিও সেটা এই যাত্রায় দেখা হবে না।
সকালে ঠিক করলাম পাঞ্চেত ড্যাম আমরা হেঁটে যাবো। এক সময় আমার সবাই ট্রেক করতাম। বয়েসের ফলে আর সেটা হয়ে ওঠে না। আজ যখন সুযোগ পাওয়া গিয়েছে তখন ছাড়া কেন। সবুজের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে নিজেদের বয়েস ভুলে আমরাও মনে প্রাণে সবুজ হয়ে যাচ্ছিলাম। পথে কয়েকটা গ্রাম পড়লো। সহজ সরল মানুষগুলোর সাথে কথা বলে বুঝতে পারছিলাম আমরা শহুরেরা কত মেকি হয়ে গেছি। আমাদের হেঁটে যাওয়ার কথা শুনে ওরা অবাক হচ্ছে।
পাঞ্চেত ড্যামে পৌঁছে দেখলাম বর্ষার জন্য জল ছাড়া হচ্ছে। দুটি লগ গেট দিয়ে সাদা ফেনা উড়িয়ে জল নামছে। যেন দুটো সাদা ঘোড়াকে লাগাম পড়িয়ে আটকে রাখা হয়েছে। মজার কথা আমরা এখন ঝাড়খণ্ডে। পাঞ্চেত ধানবাদ জেলাতে। সি আই এস এফ এর সাথে কথা বলে আমরা ব্যারেজটা ঘুরে দেখলাম, ছবি তুললাম। তারপর একটা গাড়ি ধরে ফিরে এলাম। দুপুরের খাওয়া সেরে একটু জঙ্গল ঘুরতে গেলাম। এবারের মতো ডুব দেওয়া শেষ। আবার কলকাতার সেই ডেথ সার্কেলে ফিরে যাওয়া। মনে পরে যায় সুকুমার রায়ের সেই কবিতার লাইনটি “ তোমার দেখি জীবনখানা ষোল আনাই মিছে ”।