গাড়োয়ালের গোপনপুরে মধ্যমহেশ্বর বা মদমহেশ্বরের অবস্থান। পঞ্চকেদারের দ্বিতীয় কেদার এটি। মহাভারত বলছে, মহিষরূপী মহাদেবকে পেছনের দিক থেকে জাপটে ধরেন মধ্যম পাণ্ডব অর্থাৎ ভীম। লক্ষ্য, ত্রিপুরারির বরপ্রাপ্তি। জাপটে ধরার ফলে মহিষরূপী মহাদেবের পশ্চাদভাগ পাথর হয়ে পড়ে রইল প্রথম কেদারে। দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম পীঠস্থান কেদারনাথে। মধ্যভাগ(নাভিদেশ) পড়ল অধুনা আমাদের গন্তব্য মদমহেশ্বরে। মহিষের কাঁধ বা স্কন্ধদেশ পড়ল তুঙ্গনাথে, মুখমণ্ডল পড়ল তুলনামূলক সবচেয়ে কঠিন ট্রেক রুদ্রনাথে এবং সর্বশেষ জটাটি গিয়ে পড়ে পঞ্চকেদারের শেষ কেদার কল্পেশ্বরে।
     ছোট টিম। তপনদা, অভিজিৎ এবং আমি। লক্ষ্য দ্রুততার সঙ্গে এবং স্বল্প খরচে পঞ্চকেদার দেখা। কারণ, সঙ্গে আরও একপ্রস্থ প্রোগ্রাম ঠিক হয়ে আছে। ফলে, চরৈবেতি। গৌরীকুণ্ড থেকে ভুখহরতালের বাসে সোজা উষামঠ(প্রাচীন নাম) বা উখিমঠ। মধ্য অক্টোবরের নির্মল দিনে উখিমঠের আকাশ জুড়ে শুধুই চৌখাম্বা পর্বতশৃঙ্গের গর্বিত উপস্থিতি। স্পেলবাউন্ড করে দেওয়ার মত দৃশ্য। তপনদার ডাকে যোগাসু-র জিপে গিয়ে বসলাম। দুর্দান্ত পিচ ঢালা রাস্তা। ৪৫ মিনিটেই মনসুনা হয়ে যোগাসু পৌঁছে গেলাম। দুটিমাত্র দোকান। লালাজির সহৃদয়। টুকটাক কেনাকাটার পর, স্যাকের লেফট লাগেজ লালাজির জিম্মায় রেখে ট্রেক শুরু করলাম। উতরাই ধরে নেমে এলাম যোগাসুর ব্রিজে, নিচে স্বচ্ছসলিলা মদমহেশ্বর গঙ্গা। যেন গঙ্গৈব পরমাগতিম্‌। প্রকৃত অর্থে তাইই।
       নদীবক্ষ থেকে চৌখাম্বা অপূর্ব দেখা যাচ্ছিল। সুস্পষ্ট পথরেখা ধরে পশ্চিমমুখী উনিয়ানা পৌঁছতে একঘণ্টা লাগল। গ্রামের বাচ্চাদের ‘টফি দো’ আহ্বানে যথেচ্ছ সাড়া দিয়ে ১৫ মিনিট বিশ্রাম। পৌঁছব রাশি গ্রামে। আবার রাস্তায় নেমে পড়েছি। পথ এখন উত্তরমুখী। বিশাল চওড়া রাস্তা। গুপ্ত কাশী, কালিমঠ, লেক হয়ে মূল রাস্তাটি উনিয়ানায় মিশেছে। ঘণ্টাদুয়েক বাদে হালকা চড়াই ভেঙে পৌঁছই আমাদের গন্তব্যস্থল রাঁসি(৬,৪৬০ ফুট)। বিশাল, বিস্তৃত, বর্ধিষ্ণু গ্রাম এটি। উঠলাম এই মদমহেশ্বর এলাকার অবিসংবাদী গাইড শিউরাজ সিংয়ের বাড়িতে। সিংজি বাড়িতে নেই। তবে তার সুপুত্রের দয়াতে জামাই আদরে রইলাম। রাঁসিতে রয়েছে রাকেশ্বরী দেবীর মন্দির। রাকা হচ্ছেন প্রতিপদযুক্ত পূর্ণিমা তিথি, মন্দিরের দেবী তাই রাকেশ্বরী দেবী, আর গ্রামটি রাঁসি। মদমহেশ্বর উপত্যকার শ্রেষ্ঠ গ্রাম এটি।
     অতি উৎসাহী ট্রেকাররা এই রাঁসি থেকে মান্দানি, ইয়াংবুক, বিশালী, মহাপন্থ হয়ে কেদারনাথ পর্যন্ত পদযাত্রা প্রায়শই করে থাকেন। শিউরাজ সিংজি সেই ট্রেকিংয়ে এককালে অবিসংবাদী গাইড ছিলেন। এখন তিনি যথেষ্ট প্রৌঢ়, বয়সের ভারে ন্যুব্জ। একচোখে দৃষ্টিহীন তিনি। তবে যুবাবস্থায় বঙ্গের বহু ট্রেকারের পথপ্রদর্শক ছিলেন।
     দু-চারটে প্রাইভেট হোটেলও আছে এখানে। শুনলাম, আমাদের দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু আনন্দ ও অমিয় চৌখাম্বা লজে উঠেছে। তড়িৎ বেগে সাক্ষাৎ সেরে রাকেশ্বরী মন্দির চত্বরে এলাম। অপূর্ব কাঠের মন্দির। মনোমুগ্ধকর সন্ধ্যারতি দর্শন করলাম সেখানে।
     প্রাতরাশ সেরে সকাল সাড়ে আটটায় পথে নেমে এলাম। বড় বড় গাছের জঙ্গল, মূলত চির, পাইন। তবে ওক, ফার ও রডোডেনড্রনও আছে। বাঁশঝোপ তো ছিলই। ক্রমশ উতরাইয়ের পথে নেমে এলাম গোন্ডার গ্রামে। ৭-৮ কিলোমিটার হবে বোধহয়। মধুগঙ্গার ডানপ্রান্ত দিয়ে এসেছি আমরা। বেশ জঙ্গল ছিল এখানে। বেশ কিছু বাড়িঘর থাকলেও লোকজনের দেখা সেভাবে পেলাম না। পাকা ব্রিজ পার হয়ে উঠে  এলাম বানতলিতে। বিশ্বনাথ লজের দাওয়ায় বসে চা হাতে মধুগঙ্গার বয়ে যাওয়া দেখতে দারুন লাগছিল। মদমহেশ্বর গঙ্গার(স্থানীয় সংক্ষিপ্ত নাম মধুগঙ্গা) উৎসস্থল ঘিয়া বিনায়ক খালের নিচে পবিত্র নন্দীকুণ্ড থেকে। আধঘণ্টা বিশ্রাম সেরে আবার মুসাফির পথে। টানা চড়াই পথে প্রায় চার কিলোমিটার পথ উজিয়ে চলে এলাম দুধ, দই, ঘোল ও মাঠার গ্রাম ‘নানু’। সহৃদয় গৃহকর্তা তৃপ্তিভরে মাঠা খাওয়ালেন ন্যুনতম মূল্যে, বাড়ির ক্ষেতের খিরা ফ্রিতে দিয়ে আশীর্বাদ দিলেন, যাতে আমাদের পঞ্চকেদার যাত্রা মঙ্গলময় হয়।
     সর্পিল, চড়াই পথ ধরে ঘন জঙ্গলে ঢুকে পড়লাম। উচ্চতা দ্রুত বাড়ছে, হাঁফ লাগছে বুকে। পথপ্রান্তে সামান্য জলপান সেরে ফের হাঁটা শুরু। দুর্দান্ত চড়াই পথ। জঙ্গলে ঘেরা। চারিদিক এত নিরালা-নিস্তব্ধ কেমন যেন ঝিম ধরা নেশার মত লাগে। পথে সাধুবাবাদের ভাঙ্গাচোরা কিছু ঘর নজরে পড়লেও, মদমহেশ্বর আমাদের আজ পৌঁছতেই হবে। মধ্যে আর কোনও প্রকৃত শেলটার নেই। বানতলি থেকে দমফাটা চড়াই চলছেই। প্রায় বিকেল সাড়ে তিনটে নাগাদ ক্লান্ত, অবসন্ন শরীরে পৌঁছলাম আমাদের পরমপ্রিয় গন্তব্যস্থল প্রায় ১১,৪৭৪ ফিট উঁচু মধ্যমহেশ্বর বা মদমহেশ্বরে। পাঁচ কেদারের দ্বিতীয় কেদার। দূর থেকে প্রথম দর্শনেই পাথরের এই মন্দিরটি অদ্ভুত এক ভাল লাগায় মনটা ভরিয়ে দেয়। কয়েকটা ধর্মশালা আছে, ভাল থাকাখাওয়ার ব্যবস্থা ওরাই করে দেন। গোন্ডার থেকে টানা ৯ কিলোমিটার চড়াই ভেঙ্গে চলে এলাম চৌখাম্বা পর্বতশৃঙ্গের পাদদেশে অবস্থিত এই শৈবতীর্থে। কোনও তুষারশৃঙ্গই কিন্তু মদমহেশ্বর থেকে দেখা যায় না। সংকীর্ণ অথচ সুন্দর এই উপত্যকা।
রাত্রিবাস ওখানকারই এক ধর্মশালায়। সামান্য অসুবিধা হলেও, এখানকার অপরূপ প্রাকৃতিক শোভার কাছে সেটা ধর্তব্যের মধ্যে আনা যায় না। শিঙা, ডমরু, ঢোল, কাসর-ঘণ্টা সহযোগে দেবাদিদেবের সন্ধ্যারতি দর্শন আমাদের এক অপার্থিব লোকে উন্নীত করে। পথশ্রমের কথা নিমেষে ভুলে গিয়ে এক অনির্বচনীয় আনন্দে মন-প্রাণ ভরে ওঠে। পুরাণ বলছে, এই মন্দির পাণ্ডবরা স্থাপন করেছিলেন, পরে জঙ্গলাকীর্ণ ও ভগ্নপ্রায় হয়ে পড়লে সনাতন হিন্দুধর্মের পুনঃপ্রতিষ্ঠাতা আদি শংকরাচার্য এই মন্দিরটি সংস্কার করেন এবং একজন সবসময়ের পুরোহিত রাখেন মহেশ্বরের নিত্যসেবা পূজার জন্য। তাঁর আজ্ঞাতেই কর্ণাটকের বীর শৈব সম্প্রদায় থেকেই কেবলমাত্র পুরোহিত নির্বাচিত হয়ে আসছে। যে পটভূমিতে মন্দিরটি স্থাপিত হয়েছে, তাতে স্থপতিদের মনে মনে অকুণ্ঠ সাধুবাদ প্রদান করি। মন্দিরটির আদল কেদারের মন্দিরের ন্যায়। মন্দির-সংলগ্ন অঞ্চলটি সবুজ মখমলের মত ঘাসে ঢাকা। বদ্রিনাথের দেবতা নারায়ণ বা হরি। পর্বত নীলকণ্ঠ। মধ্যমহেশ্বরের দেবতা শিব বা হর, পর্বত চৌখাম্বা। হরি-হরের এই অদ্ভূত সহাবস্থান সমগ্র হিমালয়ে বিরল।
     দু-কিলোমিটার চড়াই ভাঙলেই পৌঁছে যাওয়া যায় বৃদ্ধ মদমহেশ্বর মন্দির তথা তাল-এ। পরদিন খুব ভোরে প্রচণ্ড ঠান্ডার মধ্যে ওই দু-কিলোমিটার ফের ট্রেক করে পৌঁছই বৃদ্ধ মদমহেশ্বর এবং নির্মল আকাশে চৌখাম্বার শিখরে প্রভাতের সূর্যের কিরণমালার খেলা দেখে ফের মোহিত হয়ে যাই। চৌখাম্বা ও কেদারনাথ শৃঙ্গের অপরূপ দৃশ্য আমাদের বাকরূদ্ধ করে দেয়। ফিরে আসি মন্দির চত্বরের ধর্মশালায়। নির্জন, নিস্তব্ধ, শান্ত, কোলাহলশূন্য মদমহেশ্বর উপত্যকা থেকে একই পথে যোগাসু ফেরার বন্দোবস্ত করলাম। এবার লক্ষ্য তৃতীয় কেদার তুঙ্গনাথ- চোপতা থেকে।
দরকারি তথ্য
মদমহেশ্বর গুপ্তকাশী থেকে কালীমঠ বা উখিমঠ দু’দিক দিয়েই যাওয়া যায়। বিশাল বড় চওড়া রাস্তা মন্দির পর্যন্ত। ফলে গাইড না নিলেও চলবে। পোর্টার নিলে লেক বা উনিয়ানা বা রাঁসি থেকে পাওয়া যেতে পারে। হাওড়া থেকে নিত্যদিন পাবেন দুন এক্সপ্রেস, উপাসনা। পৌঁছন হরিদ্বার। বাস বা গাড়িতে রুদ্রপ্রয়াগ হয়ে গুপ্তকাশী হয়ে সোজা কালীমঠ বা যোগাসু ভায়া মনসুনা, উখিমঠ। তারপর ট্রেক রুট। হোটেল, ধর্মশালা, গেস্ট হাউস শিবজী’র কল্যাণে কম নেই এই পথে। সর্বশেষে লোকের বাড়ি তো আছেই। যেমন রাঁসিতে সিংজির বাড়িতে ছিলাম।
দূরত্ব
গুপ্তকাশী থেকে যোগাসু ১৭ কিলোমিটার। যোগাসু থেকে উনিয়ানা ৪ কিলোমিটার। উনিয়ানা থেকে রাঁসি ৬ কিলোমিটার, এখন যোগাসু থেকে রাঁসি পর্যন্ত জীপ যায়। রাঁসি থেকে গোন্ডার ৭ কিলোমিটার। গন্ডার থেকে বানতলি ১ কিলোমিটার। বানতলি থেকে নানু ৩ কিলোমিটার। নানু থেকে মদমহেশ্বর ৪ কিলোমিটার।
যাওয়ার সময়
মে-জুন ও সেপ্টেম্বর-অক্টোবর।