হাওড়া স্টেশান ধরে ১৬ নম্বর প্ল্যাটফর্মের দিকে প্রাণপন ছুটছি। এখনও ট্রেনটা দাঁড়িয়ে আছে। দুটো ঠেলার ওপর দিয়ে লাফিয়ে, চারটে লোককে ধাক্কা মেরে দেখলাম, ট্রেনটা নড়ে উঠে চলতে শুরু করলো। আমি তখনো বিশ গজ দূরে। শেষ শক্তিটুকু ব্যয় করে যখন গার্ডের কামরার হাতল ধরলাম তখন ট্রেন গতি নিয়েছে।
গার্ড মিঃ M K Gandhi’র মুখ নিসৃত বানী শুনতে শুনতে মোবাইলে বন্ধুদের ধরলাম। তারা ততক্ষনে আমাকে বিসর্জন দিয়ে দিয়েছে। তাদের জানালাম যে আমি পৌঁছেছি, ট্রেনেই আছি তবে গার্ডের কামরাতে। বর্ধমানে ওদের কাছে যাব।
একদিন সকালে চন্দ্রদা ফোনে জানতে চাইলো যে এ বছর আমরা কেচকী ঘুরতে গেলে কেমন হয়। শুনেই বাঙালীত্ব মাথা চাড়া দিল। সেই ‘ কোয়েলের কাছে ’-এর থেকে কোয়েলের কাছে যাওয়ার ইচ্ছে। কোয়েলের সাথে বাঙালির আত্মাকে জড়িয়ে দিয়েছেন বুদ্ধদেব গুহ। তাই আত্মা ছুটল কেচকীতে, আর পেছনে দেহের দৌড়। ফলসরূপ আমি গার্ডের কামরাতে আর তিনি তার চাকরি যাওয়ার কারণ হিসাবে আমাকে দুষছেন। যদিও বর্ধমান পর্যন্ত তার চাকরি যায়নি।
রাত থাকতে শক্তিপূঞ্জ আমাদের ডালটনগঞ্জ নামিয়ে দিল। একটু আলো ফুটতে আমরা স্টেশানের বাইরে এলাম। আগে থাকতে গাড়ি বলা ছিল। তাই ঝটপট রওনা হওয়া গেল। শহর ছাড়িয়ে বাইরে পড়তেই জঙ্গল শুরু। তবে হালকা জঙ্গল। কিন্তু সদ্য বর্ষা শেষের জন্য ঘন সবুজ। ড্রাইভার সুরয জানালো এটা বেতলার বাফার অঞ্চল। চওড়া কালো পিচের রাস্তা চলে গেছে বনের ভেতর দিয়ে। মিনিট চল্লিশ পর পাকা রাস্তা ছেড়ে গাড়ি ডান দিকের একটা কাঁচা রাস্তা ধরল। হাফ কিলোমিটার কি একটু বেশি গিয়ে একটা লোহার গ্রিলের দরজা দিয়ে বাংলোর হাতাতে গাড়ি দাঁড়ালো। আমরা পৌঁছালাম কেচকী বন বাংলো।
ডাল্টনগঞ্জের ফরেস্ট অফিস থেকে এই বাংলোর বুকিং হয়। চন্দ্রদা’র লোকজন আগে থেকেই সব ব্যবস্থা করে রেখেছিল। বারান্দাতে মালপত্র রেখে দৌড় দিলাম কোয়েলের কাছে। বাংলো থেকে কোয়েল দেখা গেলেও কাছে যেতে কয়েক মিনিট লাগে। কোয়েল এখন বেশ চওড়া। বর্ষার জলে পুরন্ত যুবতী নদী। উচ্ছলতা কম, গভীরতা বেশি। ডানদিকে চোখ ফেরালে নজর পরে একটু দূরে আওরঙ্গা আর কোয়েলের সঙ্গম। দুরন্ত এক যুবক যেন তার ভালোবাসার জন কে পেয়ে তার কাছে নিজেকে বিলীন করে দিয়ে শান্ত হয়েছে। চমক ভাঙ্গে অন্যদের ডাকে। ফিরে আসি বাস্তবে। নাস্তার আয়োজন হয়েছে। বাংলোর চৌকিদারকে টাকা দিয়ে দিলে ওই সব ব্যবস্থা করে দেয়। নিজেরা বাজার করে নিয়ে চৌকিদারকে দিলেও ও রান্না করে দেয়। আমাদের কেউ ওসব করতে পারবে না। নিজেদের মৌতাতে সময় কোথা দিয়ে যাবে তাই টের পাবে না।
একদিক থেকে এই বাংলোটি আমাদের কাছে নস্ট্যালজিক। সত্যজিৎ রায় ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’র শুটিং করেছিলেন এখানে। চার বন্ধু মিলে গাড়ি চালিয়ে এসে বিনা অনুমতিতে ওঠার বাংলো এটি। শর্মিলার টিফিন কৌটো করে খাবার পৌঁছে দেওয়ার বাংলো এটি। আমরা অবশ্য ছয় বন্ধু আর বন দপ্তরের অনুমতি নিয়ে আসা। তাছাড়া খাবারটাও চৌকিদার নিয়ে আসে। তাই আমাদের দিন রাত্রি যে অরণ্যের হবে না তা জানা কথা।
অগত্যা ড্রাইভার সুরযের কাছে জানতে চাইলাম কাল সকালে কাছাকাছির মধ্যে কোথায় ঘুরতে যাওয়া যায়। আজ বিকেলটা নিজেরাই আশেপাশে হেঁটে আর কোয়েলের ধারে ঘুরে কাটাবো। সুরয যথারীতি অন্য টুরিস্টদের মতো সিক্স পয়েন্ট, সেভেন পয়েন্ট শুরু করতেই ধমক খেল। বললাম এমন জায়গা বলো যেখানে খুব কম লোক যায় কিন্তু সুন্দর। জানা গেল লোধা ঝরণার নাম। এখান থেকে প্রায় সত্তর কিলোমিটার। বেতলা জঙ্গলের ভেতর দিয়ে রাস্তা গেছে।
গাড়ি ছুটে চলছে গাঢ় সবুজের মধ্যে দিয়ে। দু পাশে বেতলার ঘন জঙ্গল। সকালে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। রাস্তাতে তাই রোদ ছায়ার খেলা। কোয়েলের ওপর একটা ব্রিজে গাড়ি দাঁড় করিয়ে সুরয কোয়েল ভিউ দেখাল। এখান থেকে নাকি কোয়েল কে সবথেকে ভালো দেখা যায়। কে জানে, আমার তো তেমন লাগলো না। মাঝে একটা বাজার পড়ল। গরম কচুরি খেলাম আর ফেরার পথে দুপুরের ভাতের অর্ডার দিয়ে দিলাম। শেষের দিকে অনেকটা ভাঙাচোরা রাস্তা দিয়ে এসে এক পাহাড়ি চাতালে গাড়ি দাঁড়ালো। এখান থেকে এক কিলোমিটার পাহাড়ের ওপরে উঠতে হবে। সুন্দর পায়ে চলার রাস্তা আছে। আমরা নিজেরাও এতক্ষণ গাড়ি চড়ে অশান্ত। তাই এই ছোট্ট পাহাড়ি পথটা আমাদের খুব আনন্দ দিচ্ছিল। কিছুটা চলার পরেই দূর থেকে ঝরণা দেখা গেল। ত্রিধারা ঝরণা। একটি পাহাড়ি নদী তিনটি ধারাতে পাহাড়ের ওপর থেকে নামছে। এক ধারা থেকে ওপর ধারা প্রায় দেড়শ মিটার দূরে। পায়ের গতি বেড়ে গেল দেখা কে স্পর্শে পরিণত করার তাগিদে।
কাছে পৌঁছে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। ত্রিধারার মধ্যে দুটি নিচের দিকে এসে আবার মিলে গিয়েছে। সেই দুই ধারার বিপুল জলরাশি বিশালাকার হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে দুশ ফুট ওপর থেকে। হিমালয়ের নদীর ঝরণা ছাড়া এত ভীষণ আকৃতির ঝরণা আমি অন্য কোথাও দেখিনি। কাছে গেলে জলের স্প্রে একদম চান করিয়ে দিচ্ছে। সে এক অপূর্ব অনুভূতি। আমরা ঘন্টাখানেক কাটিয়ে ফিরে এলাম গাড়িতে। এবার ফেরার পালা। একই রাস্তা তে ফেরা তায় দুপুরে ভরপেট খাওয়া বলে একটু ঝিমুনি আসছিলো। আচমকা গাড়িটা ব্রেক কষতে মাথাটা ঠুকে গেল। বিরক্তি ভরে সুরযের দিকে তাকাতেই ও আস্তে বলল ‘হাতি’। অবাক হয়ে সামনে তাকাতে দেখি একটা বাচ্চা সমেত দুটো বড় রাস্তা পার হচ্ছে। তার পেছনে আরো কয়েকটা আসছে। গাড়িটাকে পাত্তা না দিয়ে তারা নিজেদের মতো হেলে দুলে রাস্তা পার হয়ে অন্য পারের জঙ্গলে ঢুকে গেল। আমরাও নিঃশ্বাস ছেড়ে রওনা হলাম। পথে বেতলা ফোর্ট থেকে এক চক্কর ঘুরে এলাম। ওই পথেই নাকি হাতি বেশি চলাচল করে। যদিও আমরা পাইনি। একদিনের জন্য যথেষ্ট উত্তেজনা হয়ে গেছে।
বিকেল গড়িয়ে যাচ্ছে। বাংলো ফিরতে ফিরতে ভাবছিলাম,আগামীকাল এই সময়ে বাড়ির পথে। সেই অর্থে আজকেই বেড়ানো শেষ। আমরা শহুরে মানুষরা প্রকৃতিকে কতো অল্প পাই। এই বিশাল প্রকৃতির মাঝে এলে অনুভব পারি, কবির সেই বাণী ‘দাও ফিরে হে অরন্য, লও হে নগর’।