একঘেঁয়ে জীবনের মধ্যে হাতে সময় মাত্র দু’দিন। শহরের ইঁট-কাঠ-জঙ্গলের বেড়াজাল থেকে বেরনোর জন্য প্রাণ ছটফট করছে। কাছে পিঠে এমন কোনও জায়গার খোঁজ চাই যেখানে থাকবে না দৈনন্দিন জীবনের বিরক্তিকর রুটিন। প্রাণ চাইছে ফোনের অহরহ রিংটোনের জায়গায় দখল নিক সমুদ্রের নোনতা ঢেউ আর ঠাণ্ডা বাতাস।
প্রাণভরা অক্সিজেন নেওয়ার আশায় ব্যাগ গুছিয়ে অবশেষে বেড়িয়ে পড়লাম বকখালির উদ্দেশে। সকালে শিয়ালদহ থেকে চেপে বসলাম নামখানা লোকালে। চলন্ত ট্রেনের পাশ দিয়ে বেড়িয়ে যাচ্ছে অজানা সব স্টেশন। যত দূর চোখ যায়, দু’পাশে শুধু পানের বরজ। দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ। চলতে চলতে এক সময় পার হয়ে গেলাম অতি পরিচিত সেই স্টেশন। নিশ্চিন্তপুর। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের পাঠকরা যাকে চেনে, ‘দিকশূন্যপুর’ নামে। মন বলে ওঠে, সব মানুষেরই তো একটা দিকশূন্যপুর থাকে। কেউ তার খোঁজ জানে? কেউ জানে না। আমার ও তো সেই দিকশূন্যপুর খুঁজতেই যাওয়া।
প্রায় তিন ঘণ্টা পর ট্রেন এসে দাঁড়াল নামখানা স্টেশনে। সেখান থেকে বেরতেই চোখে পরল অনেক ভ্যান। যা আপনাকে পৌঁছে দেবে হাতানিয়া-দোয়ানিয়ার ঘাটে। সরু এক ফালি এই নদীর পারাণি মাত্র ৫০ পয়সা আর ঘাট পারানি ৫০ পয়সা। এ যুগে এখন কোনও কাজ ১ টাকায় হয় দেখে অবাক হলাম বটে! স্থানীয় মানুষের ভিড়ে মিশে গিয়ে পৌঁছে গেলাম নদীর ওপারে। তবে বকখালি এখন অনেক দূর। নদীর ঘাট থেকে প্রায় ৪০ মিনিটের বাস রাস্তা।
বেলা ১টা নাগাদ গিয়ে পৌঁছলাম বকখালির সমুদ্র তটে। ঝাউ বন ঘেরা চারপাশে দিগন্ত বিস্তৃত সমুদ্র আর নীল আকাশ। মন ভালো করে দেওয়ার যাবতীয় উপাদান নিয়ে হাজির হল বকখালির শান্ত সমুদ্র। দিঘার সমুদ্রের মতো উচ্ছলতা নেই এখানে। পুরীর সমুদ্রের মতো পাগল করা ঢেউও নেই বকখালির। বরং এখানকার সমুদ্র শান্ত, নিস্তরঙ্গ।
পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় সমুদ্র সৈকত হল বকখালি। দামাল ঢেউ না থাকায় পর্যটনের জায়গা হিসাবে সে ভাবে ছাপ ফেলতে পারেনি। তাই অভিমানী সমুদ্র একাই থাকে নিজের মনখারাপ নিয়ে। নিজের মত নির্জনে। সমদ্রের রঙের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আকাশী নীল রঙের চাঁদোয়া বাড়িয়ে তুলেছে বকখালির আকর্ষণ। সমুদ্রের ধারে নিরিবিলিতে বসে কেটে যায় অনেকটা সময়। বিকেলের দিকে স্থানীয় মানুষজনের ইতিউতি দেখা মেলে। জোয়ার এলে দোলা লাগে জলে। পায়ের উপর আছড়ে পরে ছোট ছোট ঢেউ। বিকেলে সমুদ্রের ধারে গুটি কয় দোকান দেখতে পাওয়া যায়। সেখানে হরেক রকম খাবার বিক্রি হলেও সবচেয়ে বেশি বিকোয় গরম চা আর মাছ ভাজা। বিকেল কেটে গিয়ে সন্ধ্যা নেমে আসে। সূর্য ডোবার হালকা আলো ছুঁয়ে যায় বকখালির আকাশে। নরম আলোয় ভরে যায় বকখালির বালুকাবেলা।
সূর্যাস্তের পরও বসে থাকা যায় সমুদ্রের ধারে। ৫টি টাকা খরচ করলেই মিলবে চেয়ার। শান্ত সময় কেটে যাবে চোখের পলকে। বকখালি ঢোকার মুখে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অজস্র হোটেল। বাজেট ও পছন্দ অনুযায়ী যে কোনও হোটেলে রাত কাটানোর ব্যবস্থা করে নিন। আছে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ট্যুরিস্ট লজও। চিন্তা নেই খাবার নিয়েও। বেশ কয়েকটি ভালো খাবারের দোকান রয়েছে। যারা পছন্দ মত মেনু তৈরি করে দেয় এক লহমায়।
রাতটুকু হোটেলে কাটিয়ে পরের দিন ভোরবেলা ফের বেরিয়ে পরা সমুদ্রের ধার ধরে। সকালবেলায় সমুদ্র বেশ খানিকটা দূরে সরে যায়। আর সেই দূরে যাওয়া সমুদ্রের কাছাকাছি গিয়ে হাঁটতে অতি বড় নিন্দুকেরও মন্দ লাগার কথা নয়। এই তটেই আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে লাল কাঁকড়ার। দূর থেকে দেখে মনে হবে কেউ যেন আপনার জন্য লাল চাদর বিছিয়ে রেখেছে। অথচ কাছে গেলেই ভ্যানিশ ! আর এদের সঙ্গে দেখা মিলবে জেলেদের। অনেক দূর সমুদ্রের ছোট ছোট ঢেউয়ের মাঝে জাল ফেলে দাঁড়িয়ে তাঁরা। দেখতে লাগে একটা ছোট বিন্দুর মতো।
এরপর পায়ে পায়ে চলে যাওয়া ফ্রেজারগঞ্জের দিকে। ইংরেজ সাহেবদের পছন্দের সৈকতাবাস ছিল ফ্রেজারগঞ্জ। বাংলার ছোটলাট ফ্রেজার সাহেব এখানে এসে পাকাপাকি থাকতে শুরু করলে প্রাচীন নারায়ণগঞ্জের নাম পালটে হয়ে যায় ফ্রেজারগঞ্জ। শান্ত সাগরবেলা, সবুজ ঝাউবন আর ম্যানগ্রোভ অরণ্যর ছোঁয়া ফ্রেজারগঞ্জের প্রকৃতিকে অন্য রূপ দিয়েছে। ফ্রেজারগঞ্জ থেকে নৌকা ভাড়া করে চলে যাওয়া যায় জম্বুদ্বীপে। ঢেউয়ের সঙ্গে খেলা করতে করতে নৌকা গিয়ে পৌঁছবে সেই সবুজে মোড়া অচেনা দ্বীপভূমিতে। দ্বীপে আছে বিশালাক্ষী মন্দির ও বনবিবির মন্দির। এই দ্বীপে দেখতে পাবেন জেলেদের গ্রামও।বকখালিতে হোটেল থেকে সমুদ্রে যাওয়ার পথেই পড়বে পিশ্চমবঙ্গ বন দফতরের সংরক্ষিত অরণ্য। টিকিট কেটে ঢুকতে হয়। যদিও ভিতরকনিকা থেকে নিয়ে আসা চারটি কুমির ও সুন্দরবন থেকে আনা অনেকগুলি হরিণ ছাড়া আর কিছু নেই। হাতে সময় থাকলে চলে যাওয়া যায় হেনরিজ আইল্যান্ডে। ওয়াচ টাওয়ারে উঠে একদিকে সবুজে মোড়া সুন্দরবন আর অন্যদিকে বকখালির সমুদ্র দেখার মজাটা এখানে না এলে অনুভব করতে পারতাম না। অসাধারণ অভিঞ্জতা।
দু’দিন বকখালিতে কাটিয়ে ফের ফেরা কলকাতায়। ফেরার সময় সমুদ্রের ঢেউ এসে বারবার আছড়ে পড়ে মনের তটে। স্মৃতির ঘরে জমা পড়ে একরাশ ভাললাগা।